July 30, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, June 27th, 2021, 7:43 pm

জরুরি চিকিৎসা উপকরণের মজুদ শেষ, পূরণ হচ্ছে না হাসপাতালের চাহিদা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

দেশে করোনা মহামারীর তীব্র প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই রাজধানীর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) অধিকাংশ জরুরি চিকিৎসা উপকরণেরই মজুদ শেষ। ফলে রোগীর চাপে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় জরুরি চিকিৎসা উপকরণের সংকট দেখা দিচ্ছে। সেজন্য হাসপাতালগুলো থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে চিকিৎসা উপকরণের দ্রুত সরবরাহ চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্রও পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওই চাহিদা অধিদপ্তর পূরণ করতে পারছে না। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১২৭টি হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা চলছে। তার মধ্যে ৯৯টি সরকারি হাসপাতাল। ওসব হাসপাতালের মধ্যে ৪৫টিতে কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। রাজধানী ঢাকায় এমন দুটি সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তাছাড়া দেশের ৯ জেলায় সংকটাপন্ন কভিড-১৯ রোগীদের জন্য জরুরি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা করা হয়নি। রেমডিসিভির ইনজেকশনসহ অন্যান্য জরুরি উপকরণও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ওসব জেলার সংকটাপন্ন রোগীরা বিভাগীয় শহর বা পাশের জেলায় ভিড় করছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশে করোনার চলমান প্রবাহ মারাত্মক আকার নেয়া শুরু করে। ওই সময়ে সারা দেশেই নতুন করে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও উপকরণের চাহিদা তৈরি হয়। তখন হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে সিএমএসডিকে দেয়া হয়। তারপর থেকে দিনে দিনে ওই চাহিদার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। কিন্তুসিএমএসডি আগের চাহিদাপত্রে চাওয়া সরঞ্জাম ও উপকরণেরই সংস্থান করতে পারেনি। বর্তমানে জরুরি সরঞ্জাম ও উপকরণের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর ওসব উৎস থেকে পাওয়া উপকরণ খুবই অপ্রতুল। যদিও সংক্রমণের চলমান প্রবাহ শুরুর পরপরই সিএমএসডিতে মজুদ ফুরিয়ে আসার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। গত এপ্রিলের তথ্যানুযায়ী ওই সময়ে সিএমএসডিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের মজুদ ছিল মোট চাহিদার মাত্র ৩৯ শতাংশ। সিএমএসডির কাছে ওই সময়ে ৩ হাজার ৯১টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, ২ হাজার ২১৬টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ৯৩৭টি আইসিইউ শয্যা (মনিটরসহ), ৭৩৬টি ভেন্টিলেটর ও ২১ হাজার ২৭৯টি অক্সিজেন সিলিন্ডার চেয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু তার বিপরীতে মজুদ ছিল ৩৩০টি হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, ২ হাজার ২০০টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ৩০৭টি আইসিইউ বেড, ১০৭টি ভেন্টিলেটর ও ৮-১০ হাজার অক্সিজেন সিলিন্ডার। তাছাড়া ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫৯টি রেমডিসিভির ইনজেকশন, ১০ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৪টি আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট ও প্রচুরসংখ্যক ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্রয় জটিলতা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে চাহিদাপত্র দেয়ার আড়াই মাস পরও ওসব সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।
সূত্র জানায়, জরুরি চিকিৎসা উপকরণের মজুদ শেষ হওয়ার আগে এপ্রিলেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ওই বিষয়ে সিএমএসডি চিঠি দিয়েছিল। পরে তা ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও পায়। তবে এখনো ওই সংক্রান্ত কোনো ক্রয়াদেশ দেয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে পাওয়া উপকরণ দিয়েই পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা চালাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যদিও সিএমএসডি থেকে এতোদিন মজুদ সাপেক্ষে অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী কিছু কিছু যন্ত্রাংশ ও উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখন তার মধ্যে বেশ কয়েকটি উপকরণেরই মজুদ শেষ। বর্তমানে সিএমএসডিতে কোনো হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, রেমডিসিভির ইনজেকশন, কভিড-১৯ টেস্টিং কিট ও ভেন্টিলেটর নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডারের মজুদ ৫ হাজারে নেমে এসেছে। তাছাড়া সেখানে ৭০০টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও ১০০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শেষ হওয়ার আগেই তৃতীয় সংক্রমণ প্রবাহের আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে কভিডের সংক্রমণ বেড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ আকার নিয়েছে। গত মে মাসের শুরুতে করোনার ভারতীয় ধরন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সংক্রমণ শনাক্তের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। ওসব জেলায় এখন জরুরি চিকিৎসা উপকরণের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। ভারত সীমান্তবর্তী জেলা ঝিনাইদহে পরীক্ষার বিপরীতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার ৪১ শতাংশ। জেলার সরকারি করোনা হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রচুর কভিড-১৯ পজিটিভ রোগী এসে ভিড় করছে। এক মাস ধরেই জেলার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও এতো রোগীকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেয়ার মতো জরুরি উপকরণের সংস্থান কোনো হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানেই নেই। জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ মে মাসেই তা নিয়ে অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র দিয়েছে। কিন্তু সিএমএসডিতে ওসব উপকরণ মজুদ না থাকায় তা দিতে পারছে না অধিদপ্তর। একই অবস্থা সীমান্তবর্তী আরেক জেলা কুড়িগ্রামেও। ওই জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো আইসিইউ সুবিধা যুক্ত হয়নি। ফলে সংকটাপন্ন করোনা রোগীদের বিভাগীয় শহর রংপুরে পাঠাতে হয়। তাছাড়া নেত্রকোনা জেলায় হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। গত মাসে চাহিদাপত্র দেয়া হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।
এদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও পরিচালক (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন জানান, বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও ব্যক্তির থেকে প্রাপ্ত চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। তবে তা নিতান্তই অপ্রতুল। সরকারিভাবে কিনতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে বলা হয়। তাতে কিছুটা সময় লাগে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে কেন্দ্রী ঔষধাগারের পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান জানান, মজুদ শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে কাজ করা হচ্ছে। সিএমএসডি শুধু আদেশ অনুযায়ী উপকরণ কিনে দেয়, নিজে কোনো চাহিদা সৃষ্টি করে না। মহামারীর সময়ে চাহিদা অনুযায়ী উপকরণের সংস্থানে বিলম্ব করা হচ্ছে না।