August 1, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, June 22nd, 2021, 6:45 pm

জ্বালানি তেল পরিবহনে বিতরণ কোম্পানিগুলো ব্যাপক অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক :

জ্বালানি তেল পরিবহনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিপিসি তদন্তেও ওসব অনিয়ম উঠে এসেছে। নিয়মানুযায়ী জ্বালানি পরিবহনে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দিতে হয়। আর সেক্ষেত্রে ৩ বছর পর পর দরপত্র আহ্বান করতে হয়। কিন্তু জ্বালানি তেল পরিবহনে বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করছে না। বরং চুক্তি নবায়ন করেই বছরের পর বছর ধরে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দিয়েই জ্বালানি তেল পরিবহন করা হচ্ছে। ফলে পরিবহনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে জালিয়াতির সুযোগ। বিপিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া দেয়া, তেল চুরি হওয়াসহ বিপিসির বিতরণ কোম্পানিগুলো নানা অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমন একটি অভিযোগ আসে বিপিসির চেয়ারম্যান বরাবর। সম্প্রতি বিপিসির তদন্তে জ্বালানি তেল বিতরণ কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিরুদ্ধে জ্বালানি পরিবহনে ব্যাপক অনিয়ম অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরিবহন কাজের আড়ালে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এলপিজি ও লুব অয়েলের দরপত্র ক্রয়ে অনিয়ম এবং দরপত্র ছাড়াই একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার অভিযোগের সত্যতা মিলে। তদন্তে মেঘনা পেট্রোলিয়াম ছাড়াও বাকি দুই কোম্পানির বিরুদ্ধে জ্বালানি পরিবহনে ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। জ্বালানি পরিবহনে এমন অনিয়মের ফলে কেবল মেঘনা পেট্রোলিয়ামেরই প্রায় ৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
সূত্র জানায়, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (এমপিএল) ও পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (পিওসিএল) ১৩ বছর ধরে দুটি প্রতিষ্ঠান এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (জেওসিএল) দুটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে যথাক্রমে ১৬ ও ৬ বছর ধরে জ্বালানি পরিবহন করে আসছে। দরপত্র আহ্বান না করে ওইই কোম্পানিগুলো চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে ওসব প্রতিষ্ঠান লুব অয়েল এবং এলপিজি পরিবহন পরিচালনা করে আসছে। অথচ বিপিসির পিপিআরের অংশ ৭ ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির উপ-অনুচ্ছেদ-২ অনুযায়ী ৩ বছর পর পর দরপত্র পদ্ধতি আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের নিয়ম রয়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামে জ্বালানি পরিবহনে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে লুবজাতীয় জ্বালানি পরিবহনে ঠিকাদারদের অভিজ্ঞতা হিসেবে ৬০০ টন পরিবহনের কথা বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পুরনো ঠিকাদারকে কাজ দেয়ার জন্য ৬০০ টনের জায়গায় কোনো কারণ ছাড়াই ৬ হাজার টন করা হয়। তাছাড়া অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিতে গেলে নানা ধরনের হুমকি দিয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ভবন ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, এমপিএল, পিওসিএল ও জেওসিএলে এক দশক বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক যুগের বেশি সময় ধরে মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠান জ্বালানি পরিবহন করে আসছে। ওসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদাররা বিপিসির তিন বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ বাগিয়ে নেয়। কোনো দরপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর আইন অমান্য করে তারা চুক্তি নবায়ন করে গেছে। এমনকি জ্বালানি পরিবহনে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ওই অপকর্মে বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জড়িত থাকার সত্যতা মিলেছে। তার মধ্যে এমপিএল ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ লুব অয়েল পরিবহনে মেসার্স আইয়ুব অ্যান্ড কোম্পানি এবং এলপিজি পরিবহনে মেসার্স আজমিরি ট্রেডার্সের সঙ্গে ২ বছরের জন্য চুক্তি করে। তবে ১৩ বছর ধরে নতুন কোনো দরপত্র না দিয়ে ওই দুই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। পিওসিএল ২০০৮ সালের ৩ আগস্ট দরপত্রের মাধ্যমে লুব অয়েল পরিবহনের জন্য মেসার্স আবু তালেব অ্যান্ড ব্রাদার্সকে ২ বছরের চুক্তির মাধ্যমে নিয়োগ দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পিওসিএল কর্তৃপক্ষ কোনো সুনির্দিষ্ট ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ না করে ১৩ বছর ধরে পরিবহন দর বাড়িয়েছে। দরপত্র ছাড়াই পরিবহন কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১২ সালের ১ এপ্রিলেও এলপিজি পরিবহনের ক্ষেত্রে একই কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া জেওসিএল ২০০৫ সালে দরপত্রের মাধ্যমে লুব অয়েল পরিবহনের জন্য মেসার্স আবু তালেব অ্যান্ড ব্রাদার্সকে ২ বছরের চুক্তির মাধ্যমে নিয়োগ দিলেও তা বিগত ১৬ বছর ধরে চলমান রয়েছে। এলপিজি পরিবহনের ক্ষেত্রেও ২০১৫ সালে মেসার্স এমএম উদ্দিন অ্যান্ড ব্রাদার্সকে নিয়োগ দেয় আর বিগত ৬ বছর ধরে কোনো নিয়ম ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি বাড়িয়ে জ্বালানি পরিবহন করছে জেওসিএল।
এদিকে বিপিসি সংশ্লিষ্টদের মতে,এমপিএল নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারীরা বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। বাজার দরের অতিরিক্ত দরে পণ্য পরিবহন করায় ১৩ বছরে ওই খাতে এমপিএল অনিয়মের মাধ্যমে ৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এমপিএলের মতো পিওএল ও জেওসিএল একইভাবে এক যুগের বেশি সময় একই ঠিকাদারের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন করেছে, যা আইনত অবৈধ। তাতে কোটি কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ করেছে।
অন্যদিকে অনিয়ম প্রসঙ্গে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর ছাইফুল্লাহ আল খালেদ জানান, দীর্ঘ ১৩ বছর মেসার্স আইয়ুব ট্রেডার্সের সঙ্গে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সুসম্পর্ক ছিল। তাদের কাছে যেভাবে সার্ভিস চাওয়া হজয়েছে সেভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সার্ভিস দিয়েছে। তবে চলতি বছর দরপত্রের মাধ্যমে নতুনভাবে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন ও পরিবহন) সৈয়দ মেহদী হাসান জানান, জ্বালানি পরিবহনে মেঘনা অয়েলের ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এখন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।