August 1, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, June 27th, 2021, 7:47 pm

নিশ্চিত করা যাচ্ছে না নৌ-দুর্ঘটনার সাজা

ফাইল ছবি

নিউজ ডেস্ক :

নৌ-আদালতে নৌ-দুর্ঘটনা দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলোতে অভিযুক্ত প্রভাবশালী নৌযান মালিকসহ সংশ্নিষ্টদের যথাযথ সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সেজন্য দিনের পর দিন আসামিদের মামলায় উপস্থিত না হওয়া এবং তাদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতাকে দায়ি করছে সংশ্লিষ্টরা। এমনকি বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও তা জমা দেয়ার পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা করেও অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পার পেয়ে যাওয়ার তথ্য মিলেছে। মূলত দেশের অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনাই তদন্ত এবং প্রতিবেদন দাখিলের মধ্যেসীমাবদ্ধ থাকে। ওসব প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়িদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয় না বললেই চলে। কখনো কখনো দায়ি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা কিংবা সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দিয়েই দায় এড়ানো হয়। পরে ওই লঘু শাস্তিমূলক পদক্ষেপও উঠিয়ে নেয়া হয়। আর তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে যেসব সুপারিশ করা হয়, সেগুলোরও বাস্তবায়ন হয় না। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ৩০ বছরে দেশে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় ৪শ থেকে ৫শ তদন্ত কমিটি হয়েছে। অনেকে রিপোর্ট দিয়েছেন, অনেকেই দেয়নি। তবে জমা দেয়া রিপোর্টে সব সময় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সেগুলো যদি সঠিক সময়ে ঠিকমতো বাস্তবায়ন হতো, তাহলে নৌ-দুর্ঘটনার মাত্রা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
সূত্র জানায়, গত ৩ মে মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটের কাছে পদ্মা নদীতে নোঙর করা একটি বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে স্পিডবোট ডুবে ২৬ জন যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন ছাড়াও স্পিডবোটের চালকসহ ৪জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার আগে গত ৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের কয়লাঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে কার্গো জাহাজ ‘এসকেএল-৩’ এর বেপরোয়া ধাক্কায় যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল সাবিত আল হাসান’ ডুবে গেলে ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম কিংবা প্রতিবেদন প্রকাশে ধীর গতি রয়েছে। তাছাড়া গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি ময়ূর-২ এর আঘাতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল মর্নিং বার্ড’ ডুবে গেলে ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার দিনই ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। পরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি ২০ দফা সুপারিশ করে। ওসব সুপারিশে সদরঘাটের আশপাশ থেকে অলস বার্দিং, শিপইয়ার্ড, ডকইয়ার্ড ও খেয়াঘাট স্থানান্তর; নৌ-দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে দায়ী মাস্টার-ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারসহ নৌ-পুলিশের জনবল বৃদ্ধি; নৌ-আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধন এবং নৌ-কর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার উদ্যোগ গ্রহণসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়। তবে আইনি তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনার কারণ প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু এক বছরেও ওসব সুপারিশের বেশিরভাগেরই বাস্তবায়ন হয়নি। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলায় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী লঞ্চ ময়ূর-২ এর মালিক, সুপারভাইজার, চালকসহ এজাহারভুক্ত সব আসামি গ্রেপ্তার হলেও একে একে সবাই জামিনে বেরিয়ে গেছে।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি মোস্তফা’র দুর্ঘটনায় ৭০ জন যাত্রী নিহত হয়। তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজনকে দায়ি করার পাশাপাশি ২৪টি সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ওসব সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। তার আগে ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাওয়ায় পদ্মা নদীতে সংঘটিত আলোচিত যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমএল পিনাক-৬’ ডুবে যায়। আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটিকে টানা ৭ দিন অভিযান চালিয়েও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি। ওই সময় ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। ৬০ জন যাত্রীর খোঁজ মেলেনি। ওই দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিও একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করে। দাখিলকৃত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও বৈরী আবহাওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও দায়িত্বে অবহেলাজনিত বিভিন্ন কারণে বিআইডব্লিউটিএর মাওয়া নদীবন্দরের পরিবহন পরিদর্শক, পরিচালক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) ও যুগ্ম-পরিচালককে (নৌ-নিট্রা) দায়ী করা হয়। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ নকশার ভিত্তিতে লঞ্চটিকে নিবন্ধন প্রদান ও বিধি লঙ্ঘন করে সর্বশেষ ফিটনেস (সার্ভে) দেয়ায় ওই সময়ের সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের (বর্তমান নৌপরিবহন অধিদপ্তর) প্রধান প্রকৌশলী ও অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারককে দায়ি করা হয়। আর অতিরিক্ত যাত্রী বহনের দায়ে দায়ি লঞ্চটির মালিক ও তার ছেলেকে গেস্খপ্তার করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পায়। তাছাড়া লঞ্চের মাস্টার ও কাওড়াকান্দি ঘাটের ইজারাদারকে দায়ী করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এদিকে এ প্রসঙ্গে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর এজেডএম জালাল উদ্দিন জানান, নৌ-আদালত গত বছর পর্যন্ত ৪৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি করে দিয়েছে। তাই মামলা হয় না, বিচার হয় না- এমন একপেশে মতামত দেয়া ঠিক হবে না।