May 23, 2024

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, February 23rd, 2023, 9:53 pm

অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন করে না

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু দেশে কর্মরত অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন করছে না। বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৯টি। আর ওসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আজ পর্যন্ত ৩৮টিতে একটি সমাবর্তনও অনুষ্ঠিত হয়নি। সমাবর্তন মূলত বিশাল এক খরচের ব্যাপার। তাতে লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ওই কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কয়েক বছর মিলিয়ে একটি সমাবর্তন আয়োজন করে। তাছাড়া কত দিন পর সমাবর্তন করতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে তা স্পষ্ট করে বলা নেই। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনের অস্পষ্টতার সুযোগ নিচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ চ্যান্সেলরের সচিবালয় হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমাবর্তনের অনুমতি পেতে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে আবেদন করতে হয়। আবেদন পেলে ওই বিভাগ ইউজিসি থেকে একটি প্রতিবেদন চায়। আর ইউজিসির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি দেয়া ও না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যেসব শর্ত পূরণ হয়েছে কিনা দেখা হয় তার মধ্যে রয়েছে- আইন অনুযায়ী বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠিত কিনা; অননুমোদিত আউটার ক্যাম্পাস আছে কিনা; সরকারের বিরুদ্ধে বা নিজেদের মালিকানা সংক্রান্ত কোনো মামলা আছে কিনা; নিজস্ব ক্যাম্পাসে গিয়েছে কিনা বা ক্যাম্পাসে যাওয়ার তারিখ উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা; দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি কোনো অভিযোগ আছে কিনা; কোনো অভিযোগ তদন্তাধীন আছে কিনা; চ্যান্সেলর নিযুক্ত ভিসি-প্রোভিসি ও ট্রেজারার আছেন কিনা। এর বাইরেও আরও কিছু তথ্য নেওয়া হয়। আইন অনুসারে মূল সনদে শুধু চ্যান্সেলর নিযুক্ত ভিসি, তার নির্দিষ্ট মেয়াদকালে স্বাক্ষর করতে পারেন। সূত্র জানায়, দেশে সমাবর্তন আয়োজন না করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই বেশি। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ১১ বছরে একবারও সমাবর্তন করেনি এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য রয়েছে- ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, কিশোরগঞ্জের ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, শরীয়তপুরের জেএডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী ইউনিভার্সিটি ও কুমিল্লার ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গত ১১ বছরে রাজশাহীর বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি মাত্র একবার, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি একবার, সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটি একবার, চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দুইবার এবং চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি দু’বার সমাবর্তন করেছে। আর ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ১০ বছরে একবার মাত্র সমাবর্তন করেছে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ। কিন্তু একই সময়ে প্রতিষ্ঠা করে ১০ বছরে একবারও সমাবর্তন করেনি ফরিদপুরের টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, রাজশাহীর নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, জামালপুরের শেখ ফাজিলাতুন নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নারায়ণগঞ্জের রণদাপ্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুরের জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বরিশালের গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৯ বছরে কুমিল্লার সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবারও সমাবর্তন হয়নি। তাছাড়া ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করে গত ৮ বছরে একবারও সমাবর্তন হয়নি দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, নাটোরের বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, কুমিল্লার বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, মানিকগঞ্জের এনপিআই ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, খুলনার নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টোকনোলজি, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও বরিশালের ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। সূত্র আরো জানায়, রাজধানীর হাটখোলা রোডে অবস্থিত সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। প্রতিষ্ঠার টানা ২৯ বছরে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ২টি সমাবর্তন করতে পেরেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত উত্তরার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি ২৯ বছরে মাত্র ৬টি সমাবর্তন করেছে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামি ইউনিভার্সিটি ২৭ বছরে ৪টি, রাজধানীর আহ্ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ২৭ বছরে ১০টি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ২০টি সমাবর্তন করেছে। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২৬ বছরে গণবিশ্ববিদ্যালয় মাত্র তিনটি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি দুটি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ দুটি সমাবর্তন করেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত ফার্মগেটের ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ২৬ বছরে সমাবর্তন করেছে ৯টি। ২১ বছরে একবার মাত্র সমাবর্তন করতে পেরেছে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি। ২১ বছরে দুবার সমাবর্তন করেছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। তার বাইরে প্রতিষ্ঠার পর দুই দশকে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি ৬ বার, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ৩ বার, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ৬ বার, সিটি ইউনিভার্সিটি ৩ বার, প্রাইম ইউনিভার্সিটি ৬ বার, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ৫ বার, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ২ বার, গ্রিন ইউনিভার্সিটি ৪ বার এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ৫ বার সমাবর্তন করেছে। এদিকে বর্তমানে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তনজটে পড়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সরকার নির্ধারিত শর্তাবলি পূরণ না করায় সমাবর্তনের অনুমতি পায়নি। আবার কেউ সমাবর্তন আয়োজন করতে চেয়েও নানা কারণে তা পারছে না। এখন তারা অনুমতির অপেক্ষায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিক্য ও করোনা মহামারির কারণে মূলত সমাবর্তনজটের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২০ ও ২০২১ সালের মধ্যে প্রথম বছরের মার্চে করোনা মহামারি শুরু হলে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনও বন্ধ ছিল। তবে ২০২১ সালে মহামারির উন্নতি হলে অনলাইনে সমাবর্তন আয়োজন শুরু হয়। ২০২২ সাল থেকে ফের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শারীরিক উপস্থিতিতে সরাসরিই সমাবর্তন শুরু হয়েছে। সমাবর্তনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি বা তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে ডিগ্রি ঘোষণা করেন। এ পর্যন্ত প্রতিটি সমাবর্তনে চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষামন্ত্রী দু’জনই রাষ্ট্রীয় আরো নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁদের সময় পাওয়া বেশ কঠিন। ওই কারণেও সমাবর্তনজটের সৃষ্টি হয়। তারপরও প্রতি মাসে দু-তিনটি সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন। এর বাইরে চ্যান্সেলরকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তনেও অংশ নিতে হয়। এ মুহূর্তে সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আহ্ছানউল্লা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রামের বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, মুন্সীগঞ্জের হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, সিলেটের নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, ফেনী ইউনিভার্সিটি, দি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, খুলনার নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি খুলনা এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিবছর সমাবর্তন আয়োজন করার কথা। যারা তা করছেন না, তাদের প্রতি শিগগির কঠোর নির্দেশনা জানিয়ে চিঠি দেয়া হবে। আগে তো বছরে তিনটি সেমিস্টার ছিল, তখন চাইলে তারা বছরে তিনটি সমাবর্তনও করতে পারতো। সেখানে বছরে একটিও করা হয়নি। সমাবর্তনের নামে বিশাল জাঁকজমক করতে নিষেধ করে দেয়া হবে। কারণ, এই বিশাল ব্যয়ের পুরোটাই তো শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হয়। আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়কে বলে দেব তারা তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে যতটুকু জায়গা আছে, সেখানেই সমাবর্তন আয়োজন করবে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে হল ভাড়া করতে হবে না। এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. আবু ইউসুফ মিয়া জানান, সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। যারা তা নিয়মিত করবে না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন মেনে চলবে না, তাদের অবশ্যই সতর্ক করা এবং পরবর্তী সময়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।