September 27, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, August 23rd, 2022, 9:56 pm

অবহেলা, অসচেতনতা, গাফিলতি আর বিশৃঙ্খলায় কত প্রাণ মরবে?

ফাইল ছবি

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশৃঙ্খলা, অবহেলা ও চরম গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর উত্তরায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে গার্ডারের চাপায় গত ১৫ আগস্ট প্রাইভেট-কারে আরোহী হতাহতের ঘটনাটিকে কোনো অবস্থায় দুর্ঘটনা বলে মানতে চাইছেন না। একই পরিবারের ৫জন নিহত হলেও এর দায় কেউ নিতে চাইছেন না। প্রাথমিক তদন্তে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হলেও এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ হচ্ছে সড়ক ও জনপথ ( মওজ ) অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজি ইডি ) তত্ত্বাবধানে। প্রতিটি সংস্থার আলাদা প্রকল্প পরিচালকসহ বাস্তবায়ন ইউনিট রয়েছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় ও তদারকির জন্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নীলিমা আক্তারের নেতৃত্বে একটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট রয়েছে। তাছাড়া প্রকল্প পরামর্শক ও উপদেষ্টাও রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা তাহলে দায় থেকে বাদ যাবেন কেন এমন প্রশ্ন উঠেছে?
বিআরটি প্রকল্পের দুর্ঘটনা এটিই প্রথম নয়। নির্মাণ কাজ শুরু হবার পর থেকে এ পর্যন্ত চারটি বড় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ১৪ মার্চ বিমান বন্দর ও আব্দুল্লাহপুরে একই দিনে দুবার গার্ডার ধসের ঘটনা ঘটে। এতে তিন জন চীনা নাগরিক সহ নির্মাণ কাজ যুক্ত ছ’ শ্রমিক আহত হন। গত ১৫ জুলাই গার্ডার ছিরে পড়ে প্রকল্পের এক নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। ছ’ শ্রমিক নিহত হবার পর গঠিত তদন্ত কমিটি প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি খুঁজে পায় এবং কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কমিটির সুপারিশের কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে যা হবার তাই ঘটেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, ঘটছে প্রানহানী। আইন অনুসারে, বিদ্যমান সড়কের ওপর নির্মাণ কাজের সময় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব প্রকল্প কর্তৃপক্ষের। খানাখন্দ মেরামত করতে হয় নিয়মিত। চলাচলকারী যানবাহন ও মানুষের নিরাপত্তা বিধান করাও প্রকল্পে কাজের অংশ। এজন্য নির্মাণ এলাকা ঘিরে রাখা হয়। অথচ ১৫ আগস্ট দুর্ঘটনার সময় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল করছে ,সে সময় ক্রেন দিয়ে প্রায় ৭০ টন ওজনের গার্ডারটি ওঠানো হচ্ছিল। ক্রেন কাত হয়ে ভারসাম্য হারালে গার্ডারটি প্রাইভেট কারের ওপর গিয়ে পড়ে। এমন সময় কোনো ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী বা প্রতিবন্ধকতা দেখা যায় নি।
শুধু রাজধানীতে নয়, চট্টগ্রামেও উন্নয়ন কাজে প্রাণ হারান ১৩ জন মানুষ। ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর বহদ্দার হাটে সিডিএ’র নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের ১২, ১৩ নম্বর গার্ডার ধসে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এ ঘটনায় যে মামলা হয়েছিল তা গত নয় বছরেও নিষ্পত্তি হয় নি। মৃত্যু নিকটজনেরা আত্মজ হারিয়ে দিশেহারা। দীর্ঘ সময়ে বিচার না হওয়ায় এখন তারা বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
একই অবস্থা রাজধানীর মালিবাগের দুর্ঘটনার তদন্তে। ২০১৭ সালের ১৩ মার্চ মালিবাগে মালিবাগ মগবাজার উড়াল সড়কের গার্ডার ধসে স্বপন মিয়া (৪২) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। গার্ডারটি রেল লাইনের ওপর পড়ায় ঢাকার সাথে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। সেদিন গার্ডার তোলার সময় ক্রেন থেকে পরে। এর ছ’দিন আগে ৭ মার্চ পিলার ওপরে তোলার সময় ক্রেন ভেঙ্গে উড়ল সড়কের মৌচাক – মালিবাগ অংশে একটি গার্ডার নিচে পড়ে যায়। তবে ঘটনাটি গভীর রাতে ঘটায় কোনো প্রানহানী ঘটে নি। গণমাধ্যমের নজর এড়াতে রাতে গার্ডারটি ঘটনাস্থল থেকে খানিকটা দূরে মৌচাক মোড়ের কাছে পলিথিন দিয়ে ডেকে রাখা হয়। পরদিন চারদিকে ঘিরে গার্ডারটি ভাঙ্গার সময় গণমাধ্যমের নজরে আসে।
স্বপন মিয়ার মৃত্যুর পর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ঘটনার অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তিনি দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা হবে বলে আশ্বাস দিলেও তা আজ পর্যন্ত সম্ভব হয় নি। এত কিছুর পরও বিআরটি প্রকল্পের গুরুত্ব পূর্ণ কাজ অবহেলা, অসচেতনটা ও গাফলতিতে চলছে গাজীপুরের চন্দনা চৌরাস্তা এলাকায়। জনবহুল এই মোড়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন ও মানুষের চলাচল থাকলেও নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। ভারী যন্ত্রপাতি ওঠানো নামানোর পাশাপাশি চলছে রেলিং স্থাপনের কাজ। চলমান এসব কাজের মধ্যেও নিচ দিয়ে চলাচল করছে গন-পরিবহন ও পথচারীরা। শুধু চান্দনা চৌরাস্তা নয়, চলমান বি আরটি প্রকল্পের আব্দুলাহপুর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার সড়কে একই চিত্র। দুর্ঘটনা এড়াতে কিংবা সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে কোনো পদক্ষেপ নেই।
কাজই সচেতন না হলে আগামীতে যে আবারো দুর্ঘটনা ঘটবে না, তা বলা যায় না। সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ,গাফিলতি, অসচেতনতা ও বিশৃঙ্খলায় আর কত প্রাণ ঝরবে?