January 23, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Wednesday, December 1st, 2021, 8:30 pm

ইউপি নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে নৌকার ভরাডুবি

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সংঘাত-সহিংসতার মধ্যে চলমান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের প্রায় ৪৭ শতাংশ হেরে গেছে। নির্বাচন কমিশনের বেসরকারি ফলাফলে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, ইসি রোববার ভোট হওয়া এক হাজার ইউপির মধ্যে ৯৯২টির ফলাফল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জিতেছেন ৫২৫টি ইউপিতে। শতকরা হিসাবে যা ৫২.৯২ শতাংশ ইউপিতে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শুধু চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হয়।
উক্ত ফলাফলে দেখা যায়, ৪৪.৯৫ শতাংশ ইউপিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ১৭টি এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়াতে উলামায়ে ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ একটি করে ইউপিতে জয়ী হয়েছে।
নৌকার প্রার্থীদের এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দেওয়াকেই দায়ী করছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা। এ ছাড়া তাঁরা বলছেন, যাঁরা মনোনয়ন পেয়েছেন তাঁদের অনেকের প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় বিভেদও পরাজয়ের একটা কারণ। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতারা আবার দায়ী করছেন তৃণমূল নেতাদেরই। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূল নেতাদের সুপারিশেই প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, নোয়াখালীর সেনবাগে একটি ইউনিয়নেও জয় পায়নি আওয়ামী লীগ। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে নৌকার হার হয়েছে। গাজীপুরে নিজেদের ব্যাপক জনসমর্থন আছে দাবি করে থাকেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেই গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক পৌরসভা ও সাত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে মাত্র একটি ইউপিতে নৌকা জিতেছে। ওই ইউপি চেয়ারম্যান আবার জিতেছেন বিনা ভোটে। নওগাঁর মান্দা উপজেলার ১৪ ইউপির ১১টিতে নৌকা হেরেছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন উপজেলার ১৫ ইউপির মধ্যে ১৪টিতেই নৌকার পরাজয় হয়েছে। আরো অনেক উপজেলায় এমন ভরাডুবির ঘটনা ঘটেছে।
এর আগে গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের ৫৮.২৭ শতাংশ জয়ী হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয় ৩৯.৫৬ শতাংশে। দ্বিতীয় ধাপে ৮৩৪টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা জয়ী হন ৪৮৬টিতে। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৮১ জনও রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেন ৩৩০টিতে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা ছাড়াও ৬৪ ইউপিতে বিএনপির প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে জেতেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় ধাপে জাতীয় পার্টি ১০টি, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ চারটি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি), খেলাফত মজলিশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা একটি করে ইউপিতে জয়ী হন।
প্রথম ধাপে দুই দফায় গত ২১ জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ৭৩.৪৮ শতাংশ ইউপিতে জয়ী হন। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ২৪.২২ শতাংশ ইউপিতে। ওই নির্বাচনে ৩৬৫টি ইউপির মধ্যে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা ২৬৯টিতে জয়ী হন। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭২টিতে জয়ী হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ৮৮টিতে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি তিনটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) তিনটি এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীরা একটি করে ইউপিতে জেতেন।
নোয়াখালী, ঝিনাইদহ,গাজীপুর, নওগাঁ ছাড়াও সূত্র জানায়, রংপুরের তারাগঞ্জ, সদর ও কাউনিয়া উপজেলার ১৩ ইউপির মধ্যে ৯টিতে ভরাডুবি হয়েছে নৌকার। পিরোজপুরের কাউখালীতে দুটিতে হেরেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউপিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও পূর্বধলা উপজেলার ২৪টির বেসরকারি ফলাফলে ১৫টি, পঞ্চগড় সদর ও আটোয়ারী উপজেলার ১৫টি ইউপির মধ্যে ৯টিতে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী, নাগরপুর ও মধুপুর উপজেলার ২৪টি ইউপির আটটিতে, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও পলাশবাড়ী উপজেলার ১৭টির মধ্যে ১৩টিতে নৌকার প্রার্থীরা পরাজিত হন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ১৩ ইউপির পাঁচটিতে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টিতেই, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ছয়টির মধ্যে চারটিতে, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ১৩ ইউপির ছয়টিতে, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ১২টি ইউপির মধ্যে ছয়টিতে নৌকার প্রার্থীরা হেরে যান।
তবে ময়মনসিংহে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় ময়মনসিংহের ধোবাউড়া এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলার ২০টি ইউনিয়নে ভরাডুবির পর তৃতীয় দফায় ভালো ফল করেছে আওয়ামী লীগ। তৃতীয় দফায় ৩ উপজেলার ২৭ ইউপির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৪ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। ত্রিশালের একটি ইউপির ফল স্থগিত রয়েছে।
এর আগে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছিল। ধোবাউড়ার সাতটি ইউপির মধ্যে ছয়টির ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। ছয়টির মধ্যে মাত্র একটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতেছিলেন। ধোবাউড়ার একটি ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাত্র ১৫৮টি ভোট পেয়েছিলেন। এ উপজেলার অপর ২টি ইউপিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যথাক্রমে ৩৭৬ এবং ৩৯২ ভোট পেয়েছিলেন। ফুলবাড়িয়ায় দ্বিতীয় দফায় ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র ৪টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছিলেন।
স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় দফায় আওয়ামী লীগের ফল দ্বিতীয় দফার চেয়ে ভালো হয়েছে। ২৭টি ইউপির মধ্যে ১৪টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। রোববার ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল এবং মুক্তাগাছা উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের তিনটিতে নৌকার প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তাঁরা হলেন বোরোরচর ইউপিতে আশরাফুল আলম সাব্বির, অষ্টাধর ইউপিতে এমদাদুল হক আরমান, কুষ্টিয়া ইউপিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম শামসুল হক।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রিশালের ১২টি ইউপির মধ্যে রামপুর ইউপির ফল স্থগিত রয়েছে। বাকি ১১টি ইউপির মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। অপরদিকে মুক্তাগাছায় ১০টি ইউপির মধ্যে ৫টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বাকি পাঁচটির মধ্যে চারটিতেই বিদ্রোহীরা এবং একটিতে বিএনপির নেতার জয় হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজশাহীতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে একমাত্র নারী চেয়ারম্যান প্রার্থী নৌকা প্রতীক নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন। ফাহিমা বেগম রাজশাহী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক। গত নির্বাচনেও তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলীয় নেতাদের সমর্থন না পেয়ে তিনি ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কাছে হেরে যান।