January 23, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, December 6th, 2021, 8:43 pm

ইউপি নির্বাচন: বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় আওয়ামী লীগ

প্রতীকী ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলের বিদ্রোহীদের নিয়ে বিপাকে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যারা বিদ্রোহী হবেন তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনে তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না। এখন এই বহিষ্কার নিয়ে দেখা দিয়েছে দোটানা। স্থানীয়ভাবে অনেক জনপ্রিয় নেতা এবার দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এলাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থান ধরে রেখেছেন। পাশাপাশি দলে তাদের অবদানও রয়েছে অনেক। তাদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তৃণমূল আওয়ামী লীগে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। দলের শক্তিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বহিষ্কার করা না হলে বিদ্রোহীর সংখ্যা আরও বাড়বে। দলের চেইন অব কমান্ডে ফাটল দেখা দিতে পারে। সবমিলিয়ে বিদ্রোহী ইস্যুতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে আওয়ামী লীগ।
জানা যায়, বিদ্রোহী দমনে আওয়ামী লীগের কোনো কৌশলই কাজে আসছে না। দলীয় সাধারণ সম্পাদক বার বার বলছেন, এবারের বিদ্রোহীরা চিরদিনের জন্য বহিস্কৃত হবেন। যদিও দলের নেতাকর্মীরা এটিকে কৌশলের ঘোষণা বলেই বিশ্বাস করেন। সময়ে বহিষ্কার, অসময়ে প্রত্যাহার; এসব দেখে বহিষ্কারের ঘোষণা এখন যেন আর কাউকেই বিচলিত করে না। বিদ্রোহীদের বিজয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দলীয় ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে হলে, লোম পরিস্কার করতে গিয়ে কম্বলই না আবার খালি হয়ে যায়!
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ধাপের (১১ নভেম্বর) ইউপি নির্বাচনের পর ৪০ জন কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে বিদ্রোহীদের মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। এই নির্বাচনে ৪২ শতাংশ নৌকার প্রার্থী পরাজিত হন। ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় মদদদাতাদের শাস্তির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।
তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনের পর এখন আবার বিদ্রোহীদের মদদদাতা নেতা, মন্ত্রী, এমপিদের তালিকা করার কাজ শুরু হয়েছে। ২৮ নভেম্বরের এই নির্বাচনে ৪৭ শতাংশ নৌকা প্রতীকের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এক হাজার আট ইউপির মধ্যে ৪৪৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।
এর আগে ২০১৯ সালের জুনে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে অন্তত ৬০ জন মন্ত্রী, এমপিসহ দুই শতাধিক নেতার বিরুদ্ধে। সে বছরের ১২ জুলাই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় বিদ্রোহী ও তাঁদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিদ্রোহীদের কারণ দর্শানোর চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু মদদদাতাদের বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপও তাদের দেওয়া সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, ইউপি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। তারা গত নভেম্বর মাসের সংঘাত ও হতাহতের তথ্য দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
জানা যায়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সারা দেশ থেকে হাজারখানেক অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রতি জেলায় অন্তত পাঁচ থেকে সাতটি অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন তাঁরা। এসব অভিযোগের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে জমা দিয়েছেন তাঁরা।
ঐতিহ্যগতভাবে একসময় আওয়ামী রাজনীতিতে সুবিধাবাদীদের প্রাধান্য ছিল না। তাই দলটিতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাকর্মীর প্রাধান্য ছিল। কালের নিষ্ঠুর নিয়তিতে দলটি যেন ক্রমেই তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দীর্ঘ দেড় যুগ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও দলটির নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা যেন নিজ গৃহেই নির্বাসনে। ক্ষমতাশীন দলের নেতা কর্মী হয়েও অনেক স্থানেই ত্যাগীরা যেনো পরগাছা।
এমন পরিস্থিতিতে আবারও বিদ্রোহীদের সহযোগিতাকারীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে বলে দলটির কেন্দ্রীয় সূত্র থেকে জানা গেছে। আট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ তালিকা তৈরি করছেন। এই নেতারা মনে করছেন, এবার সত্যিই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। না হলে দলে অন্তঃকোন্দল নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হবে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের প্রার্থী চূড়ান্ত করা অন্যান্য জেলার চিত্রও একই। পরের ধাপগুলোয় বিদ্রোহীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক পেলেই নির্বাচনে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে এমনটি ধারণা করেই বিদ্রোহীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, আওয়ামী লীগ জেলা-উপজেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আধিপত্যের কারণেও বিদ্রোহীর সংখ্যা বাড়ছে।
অন্যদিকে, বিশেষ নেতাদের সবুজ সংকেত আর মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেও অনেক জায়গায় বিদ্রোহীরা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের দমাতে ব্যর্থ হলে, তা দলীয় প্রার্থীদের জন্য বড় ফ্যাক্টর হবে বলে ধারণা করছে নেতাকর্মীরা।
তবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিদ্রোহীদের পক্ষে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। যাঁরা বিদ্রোহীদের মদদ দিয়েছেন তাঁদের বিরুদ্ধে দল এবার কঠোর হবে। মদদদাতা এমপিরা ভবিষ্যতে মনোনয়ন পাবেন না।
এদিকে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পঞ্চম ধাপে কিশোরগঞ্জের তিন হাওর উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে থাকছে না আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক। ফলে দলের যে কেউ এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড এ সিদ্ধান্ত নেয়।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জানা গেছে, পঞ্চম ধাপে ৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার সাত ও অষ্টগ্রাম উপজেলার আট ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইটনা উপজেলার ৯ ইউপিতে ভোটগ্রহণ হবে পরের ধাপে। এ ইউনিয়নের এখনও নির্বাচনী তফসীল ঘোষণা হয়নি।
সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক জানান, শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
উল্লেখ্য, হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জের এ তিন উপজেলা বরাবরই আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাটি। এখান থেকে ছয়বার এমপি নির্বাচিত হন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এ ছাড়া পর পর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক।