September 25, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, January 20th, 2022, 9:31 pm

ইসি গঠনে আইন, চলছে নানা মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনকে নিরপেক্ষ ও সন্তোষজনক করার জন্য প্রয়াসের ঘাটতি রাখেননি মহামান্য রাষ্ট্রপতি। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংলাপে লিপ্ত ছিলেন। সর্বশেষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ। মাসব্যাপী চলা এই সংলাপে প্রায় সব দলই আইন প্রণয়নের কথা বলেছে। সংলাপের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব প্রক্রিয়া শেষ করে আইনটি কার্যকর করা হবে। একই দিন নির্বাচন কমিশন গঠন আইনের একটি খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে জানা যায়, মন্ত্রিসভায় খসড়া অনুমোদন দেওয়া হলেও রাজনৈতিক মহলে এখনো একটা সন্দেহ দানা বেঁধে আছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ফলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে চিরাচরিত অনৈক্যের ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে এবারও। কয়েক যুগের রাজনৈতিক বিরোধ মেটার কোনো পথ তৈরির আভাসও পাওয়া যাচ্ছে না অদ্যবধি।
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনা শেষে অবশ্য একটি বিষয় পরিস্কার হয়েছে যে ইসি নির্বাচন কমিশন একটি আইন পাসের মাধ্যমেই গঠিত হবে। এ বিষয়টি ইতোমধ্যে পরিস্কার করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ মেনে ইসি গঠনে একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সরকার এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া উত্থাপনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি অবশ্য এতেও কোন ভরসা পাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন নিয়োগে যে আইন হচ্ছে, তার ফলে ‘যে লাউ সেই কদু’ হবে বলে মনে করেছে দলটির স্থায়ী কমিটি। এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, ‘ইসি নিয়োগে মন্ত্রিসভায় যে আইনের খসড়া অনুমোদন হয়েছে, তাতে ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’ বা একটি ‘পচা কদু’ হতে যাচ্ছে। ‘অনুগত ও অপদার্থ’ ইসি গঠনের চলমান প্রক্রিয়াকে দলীয় স্বার্থে আইনি রূপ দেওয়ার সরকারি অপপ্রয়াসের ফলাফল হবে ‘যেই লাউ, সেই কদু’। এবার সম্ভবত হতে যাচ্ছে একটি পচা কদু।‘
উল্লেখ্য, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর আগেই রাষ্ট্রপতিকে নতুন ইসির নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। সংসদের অধিবেশনও চলমান। যদিও করোনার কারণে সপ্তাহে দুই থেকে চার দিনের বেশি অধিবেশন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
একটি ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে, দীর্ঘ ৫০ বছর পরে হলেও সংবিধানের নির্দেশনা মেনে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেকে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, কয়েক মাস ধরে আইনমন্ত্রী বলেছেন- এত কম সময়ে নতুন আইন সম্ভব নয়। এখন আবার তাড়াহুড়ো করে আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আইনের খসড়ায় সার্চ কমিটির সদস্য হিসেবে যাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তাতে সরকারের ইচ্ছার বাইরে কিছু ঘটবে বলে আশা করা যায় না।
দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন সংশোধনের ব্যাপারে কোন রকম প্রস্তাব বা সুপারিশ এখন পর্যন্ত আসেনি বলে জানা গেছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি এক বিবৃতিতে আইনের খসড়া
অনুমোদনকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে নাগরিক সমাজসহ অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া চূড়ান্ত করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। আইনটির খসড়া অবিলম্বে সবার জন্য উন্মুক্ত করার দাবিও জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত মূলত কী ধরনের আইন হতে যাচ্ছে এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া সকলেই অন্ধকারে আছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও ড্রাফটিং উইংয়ের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হলেও এই আইনের খসড়ার বিষয়ে তারা পুরোপুরি অন্ধকারে। এমনকি খসড়া আইনটির অনুলিপিও সংশ্নিষ্টদের হাতে নেই। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বৈঠকের পরে যে ব্রিফিং করেছেন তার বাইরে খসড়া আইনে কী রয়েছে, তা নিয়েও সংশ্নিষ্টরা রয়েছেন অনেকটাই অন্ধকারে।
তবে এই বিষয়টিকে অন্ধকারে ফেলে রাখা নয় বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, খসড়াটি ভোটিংয়ের জন্য এখন আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে এটি সংসদে উত্থাপনের পরে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। সেখান থেকে সুপারিশ আকারে সংসদের বৈঠকে উঠবে।
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসি গঠনের আগের দু’বারের মতো এবারও সার্চ কমিটিতেই সীমাবদ্ধ থাকার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। তবে গত ১০ ডিসেম্বর থেকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ শুরু হওয়ার পর থেকেই নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়ে ঘরে-বাইরে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছিল। সরকারের ‘সহযোগী বা মিত্র’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় জোটের অনেক শরিকই আইন প্রণয়নের পক্ষে নিজেদের মত তুলে ধরেছে রাষ্ট্রপতির কাছে। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত বন্ধুরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের পক্ষ থেকেও ইসি গঠনে নতুন আইনের বিষয়ে আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার তার অবস্থান অনেকটাই পরিবর্তন করেছে।
তবে ইসি পুনর্গঠনে যতোই তোড়জোড় করা হোক না কেন জাতীয় নির্বাচনে সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া ইসির নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয় বলে মত প্রকাশ করছেন বিরোধী দলের অনেক নেতা। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সদস্য এবং বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সমস্যা, তা ইসির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। আইনে যত ক্ষমতাই দেওয়া হোক সরকার না চাইলে ইসির কিছুই করার সুযোগ নেই। নির্বাচনকালীন সরকার কে থাকবে- সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ অতীতে দেখা গেছে, ড. শামসুল হুদা কমিশন নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চাইলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাতে রাজি হয়নি। এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে তৎকালীন সিইসি ড. শামসুল হুদা কমিশনের পক্ষ থেকে আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সম্ভাব্যদের একটি প্যানেল তৈরি করবে সার্চ কমিটি। এ কমিটিতে আহ্বায়ক হবেন বিদায়ী সিইসি। পাশাপাশি প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান সদস্য থাকবেন। ওই কমিটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিটি পদের বিপরীতে তিনজনের নাম প্রস্তাব করবে। পরে সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটি (সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে) তা পরীক্ষা করে বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে।
ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, সৎ বিবেচিত না হলে, বৈধ আয়ের ভিত্তিতে জীবন নির্বাহ না করলে, জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বা অঙ্গ সংগঠনের সদস্য হলে, রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচনের ইচ্ছে প্রকাশ করলে এবং তার প্রার্থিতা বিবেচনার তারিখ থেকে এক বছরের মধ্যে সাধারণ ঋণ গ্রহীতা, কোম্পানির পরিচালক বা অংশীদার হিসেবে ঋণ বা ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে থাকলে ওই ব্যক্তি সিইসি বা নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
যদিও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর সাবেক সিইসি শামসুল হুদা বলেছেন, সংসদের চেহারা এমন হবে, তা তারা খসড়া তৈরির সময় ধারণা করতে পারেননি। তাই সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বিষয়টি তখন যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন তা নেই।
জাতীয় নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিরপেক্ষ ইসি গঠনের বিকল্প নেই। তবে এটাও সত্য পৃথিবীতে নিরপেক্ষ কেউ নেই। কাজেই বিশ্বের কাছে নিজেদের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য যতোটা সম্ভব সরকারকে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।