February 2, 2023

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, December 12th, 2022, 6:56 pm

খুলনায় অভিনব পন্থায় অতিথি পাখি শিকার

ফাইল ছবি

প্রতিবছরই শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে পাখিরা আসে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলাশয়ে। মূলত নভেম্বর থেকে শুরু করে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত অবস্থান করে এসব পাখি। শীত শেষ হলে আবার ফিরে যায় তারা। এবছরও ব্যতিক্রম ঘটেনি।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা নড়াইলসহ খুলনা, বাগেরহাট ও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিল ও জলাশয়গুলোতে দল বেঁধে আসতে শুরু করেছে অতিথি পাখিরা। পানি কমে আসা জলাশয়গুলোতে খাবারের সন্ধানে অতিথি পাখির সঙ্গে আসছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখিও। আর এই সুযোগে ফাঁদ পেতে নির্বিচারে পাখি নিধন করছে অসাধু শিকারিরা।

অন্যান্য বছরের মতো এবারও মাছে বিষ দেয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তির ফাঁদ পেতে অভিনব কৌশলে পাখি শিকার করছে তারা। প্রতি বছর প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ থেকে আত্মরক্ষার্থে সুদূর হিমালয়, সাইবেরিয়াসহ শীত প্রধান অঞ্চল থেকে অতিথি পাখি এ অঞ্চলে আসে। এসব পাখির মধ্যে রয়েছে বালি হাঁস, জলপিপি, কোম্বডাক, সরালী, কাস্তে চাড়া, পাতাড়ি হাঁস, কাদা খোচা, ডংকুর, হুরহুর, খয়রা ও সোনা রিজিয়া অন্যতম। স্থানীয় পেশাদার শিকারিরা আইনের তোয়াক্কা না করে প্রতিবছরেই মেতে ওঠে পাখি নিধনে। এতে করে কমতে থাকে অতিথি পাখির সংখ্যা।

পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০ দশকে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির অতিথি পাখি আসতো। বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে ৬০ থেকে ৭০ চলে এসেছে। এবছর শীতের আগেভাগেই নড়াইলের চাঁচুড়ী বিল, ইছামতি বিল, কাড়ার বিল, নলামারা বিল, তালবাড়িয়া বিল, পাচুড়িয়া বিল, গোপালপুর-বগুড়ার বিল হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে।

এছাড়াও,খুলনার ৯টি উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ও। এই অঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় খাল-বিল, জলাশয় ও চিংড়ি ঘের রয়েছে। মূলত এসব জলাশয়ে শীত মৌসুমে অল্প পানিতে মাছ শিকারের জন্য প্রচুর পরিমাণে পাখি আসে। বিদেশি পাখিদের সঙ্গে থাকে- বালি হাঁস, কালকোচ, কায়েম, ডুঙ্কর, পানকৌড়ি, পাতাড়ি হাঁস, হাঁস ডিঙ্গি, কাদা খোঁচা, খয়রা, চেগা, কাচিচোরা, মদনটাক, শামুখখোলা ও বকসহ নানা প্রজাতির পাখি। সন্ধ্যা নামতেই বিভিন্ন প্রজাতির এসব পাখি দল বেঁধে এসব এলাকায় গিয়ে খাদ্য সংগ্রহে নেমে পড়ে। আর সেখানে আগে থেকেই ওৎ পেতে থাকে শিকারি চক্র।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে শিকারিরা রাতে অবাধে পাখি নিধন করে আসছে। শিকারিরা রাতে জলাশয়ের পাশে ফাঁদ পেতে রেখে ধানক্ষেতে বসে পাখির ডাকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাঁশি বাজায়। এতে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক পাখিই সেখানে উড়ে এসে শিকারির ফাঁদে পড়ে আটকে যায়।

দাকোপ উপজেলার সুতারখালী গ্রামের এক শিকারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তালপাতার সঙ্গে স্কচটেপ জড়িয়ে মোটরসাইকেলের হাইড্রোলিকের কভারের এক মাথায় সুপারগ্লু লাগিয়ে রাবারের সাহায্যে তৈরি করা হয় অভিনব এই বাঁশি।

এছাড়াও শিকারিরা নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি ছোট-বড় ফাঁদ পাখির চলার পথে পেতে রাখে। রাতে পাখিরা যখন উড়ে বেড়ায়, তখন ওই ফাঁদে শত শত পাখি আটকা পড়ে। আবার চোখে আলো ফেলে, কেঁচো দিয়ে বড়শি পেতে, কোচ মেরে ও কারেন্ট জাল পেতেও পাখি শিকার করে থাকে কিছু শিকারি। কেউ কেউ আবার মাছ ও ফড়িং দিয়ে ফাঁদ পেতে, কীট-পতঙ্গের সঙ্গে কীটনাশকের টোপ দিয়ে, খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে, বড়শি ও কারেন্ট জালের ফাঁদ পেতেও পাখি শিকার করে থাকে। এসব ফাঁদে এক-এক জন শিকারি এক রাতেই নিধন করে কয়েকশ অতিথি পাখি।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এবছর শিকারি চক্র প্রযুক্তির সহায়তায় নিয়েও পাখি শিকার করছে। তারা অতিথি পাখিদের ডাক আগে থেকেই ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে পোর্টেবল সাউন্ড-বক্সে ঢুকিয়ে রাখে। যেখানে পাখিদের আনাগোনা বেশি সেসব বিল ও জলাশয়ের বৃহৎ এলাকা জুড়ে জালের ফাঁদ পাতে। আর মাঝখানে ওই পোর্টেবল সাউন্ড-বক্সে পাখির ডাক বাজানো শুরু করে। আর ওই ডাক শুনে সতীর্থদের নিরাপদ অবস্থান মনে করে শিকারির পাতা ফাঁদে নামতে শুরু করে পাখিরা।

দাকোপ এলাকার কয়েকজন পাখি শিকারি সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি রাতেই ধানক্ষেতে বসে পাখির ডাকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বাঁশি অথবা মোবাইল ফোনে রেকর্ড বাজিয়ে উড়ন্ত পাখিদের নিচে নামানো হয়। পরে ফাঁদে ফেলে পাখি শিকার করা হয়। এসব পাখি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

দাকোপ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. পরিতোষ কুমার রায় বলেন, তিনি তার দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে খোঁজ-খবর নিয়ে শিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। একই চিত্র পার্শ্ববর্তী রামপালেরও।

উপজেলার কালেখারবের এলাকার এক পাখি শিকারি তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, পাঁচ বছর ধরে তিনি পাখি ধরেন। প্রথমে শখের বসে ধরতেন। এখন বছরের প্রায় ছয় মাস এই পাখি বিক্রির করেই তার সংসার চলে। আকার ভেদে ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত একেকটি পাখি বিক্রি হয়। এই সময়টা ভালোই চলে তার। তবে একটু গোপনে করতে হয়।

পাইকগাছা উপজেলার বাতিখালী বনায়ন সমিতির অধ্যাপক জিএমএম আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘পাখিরা রাতের চেয়ে দিনের বেলায় বেশি নিরাপত্তাহীন থাকে। বিশেষ করে রাতের নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে সকালে যখন খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে তখন তাদের শিকারিদের কবলে পড়তে হয়।’ পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।

পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খান বলেন, ‘পাখি শিকারের জন্য দেয়া বিষযুক্ত মাছ অন্যান্য মাছ এবং মাংসাশী প্রাণিরাও খেয়ে থাকে। এছাড়া বিষযুক্ত মাছ খেয়ে সব পাখি সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ হয় না, অনেক পাখি আছে যারা কিছুদিন যন্ত্রনা ভোগের পর মারা যায়। বিষ খাওয়া পাখি শিকারিদের হাতে ধরা না পড়ালেও বিপদজনক। ওই পাখি যখন মারা যায় তখন, সাপ, ইঁদুর, শেয়াল, চিল, কাকসহ মাংসাশী প্রাণিরা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক কথায়, বিষযুক্ত মাছ দিয়ে পাখি শিকারের ফলে শুধু অতিথি পাখি বা দেশি পাখি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা নয়; পুরো জীব বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় যার ফলে পরিবেশের উপর একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় যারা পাখি শিকার করে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সচেতন করতে হবে পাখি রক্ষায়। সব শ্রেণির নাগরিকদের সচেতন করলে পাখি শিকার বন্ধ হবে। আর এতে প্রকৃতিতে আগের মতোই পাখির দেখা মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।’

পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে জানিয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস জানান, গত ৬ নবেম্বর তিলডাঙ্গা ইউনিয়নে বটবুনিয়া গ্রামের শহিদুল বিশ্বাসের ছেলে রায়হান বিশ্বাস (২৬) কামিনিবাসিয়া পুলিশ ফাঁড়ির কাছে বিলের ভেতর বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে পাখি শিকারে যায়। বেলা ১১টার দিকে ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. রতন হোসেন অভিযান চালিয়ে একটি অতিথি পাখি (কালাতিতি) ও পাখি ধরার সরঞ্জামসহ রায়হানকে বিলের ভেতর থেকে হাতে নাতে আটক করে। বিকেলে তার আদালত তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান।

এছাড়াও অতিথি পাখি খাওয়ার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ ও বহনের দায়ে গত ৭ নবেম্বর সুতারখালী ইউনিয়নের একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজিবুল আলম বলেন, পাখি শিকারের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন এলাকার শিকারিদের তালিকা করা হচ্ছে। খুব দ্রুত শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এছাড়াও বিভিন্ন ভাবে পাখি শিকার বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি বলেও তিনি জানান।

—ইউএনবি