September 29, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Friday, December 31st, 2021, 8:35 pm

গ্যাসের সহজপ্রাপ্যতার দ্বার রুদ্ধ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একসময় বলা হয়েছিল, ‘দেশ গ্যাসের উপর ভাসছে’ – ফলে গ্যাস রপ্তানি করো। আর এখন বলা হচ্ছে ‘দেশে গ্যাসের সংকট, তাই গ্যাস আমদানি করতে হবে।’ গত ১০ বছরে গ্যাসের দাম বেড়েছে সাতবার। এর মধ্যে সব থেকে বেশি বেড়েছে আবাসিকের চুলায়, সিএনজি ও শিল্পকারখানার ক্যাপটিভ বিদ্যুতে। প্রথম দুটির ভোক্তা সরাসরি সাধারণ মানুষ। তৃতীয়টি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে জনগণের কাছ থেকেই বাড়তি টাকা তুলে নেন। আর আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শ্রমিকের বেতনের ওপর কোপ পড়ে। শেষতক জ¦ালানি পণ্য গ্যাস বা তেলের দাম যা-ই বাড়াক সরকার বাহাদুর, তার দায় সাধারণ মানুষের ওপরই গিয়ে বর্তায়।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকারের যুক্তি হলো, বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে তা কম দামে দেওয়ায় বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এটি সমন্বয় করার জন্যই এখন দাম বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারে যা দাম তার চেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনছে কেন সরকার?
সরকারের এই যুক্তি মূলত চটকদার বিজ্ঞাপনের মতোই আধা সত্য। দেশে গ্যাস-সংকটের কারণেই সরকার এলএনজি আমদানি করছে। কিন্তু গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে গত ১০ বছর সরকার বিশেষ কিছু করেনি। এলএনজি আমদানি করার ব্যাপক পরিকল্পনা ১০ বছর ধরেই সরকার করলেও এ সময় স্থল ও সাগরভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য তেমন কিছু করেনি। এভাবে গ্যাস-সংকট অনিবার্য করে তুলে উচ্চমূল্যের এলএনজির দাম ভোক্তার কাঁধে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ যখন ৮০০ টাকার গ্যাসের দাম ১৭৫ টাকা বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা করেছে, ভারত তখন ৭৬৩ রুপির গ্যাসের দাম ১০১ রুপি কমিয়ে ৬৬২ রুপি করেছে। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমেছে যখন ৫০ শতাংশ, তখন আমরা বাড়িয়েছি গড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ।
কিছুদিন আগেও ১২ কেজির ফ্রেশ কোম্পানির এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে একই ওজনের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ১২২৮ টাকায়। বাজারে সয়াবিন তেল, পেঁয়াজসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের দামও দফায় দফায় বেড়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ার আগে চটপটি ও ফুচকা বিক্রেতারাও পড়েছে বিপদে। আগে চটপটি ও ফুচকা বিক্রি করে খরচ বাদে তারা ৮০০-৯০০ টাকা আয় করতে পারতো। এখন একই পরিমাণে বিক্রি করে খরচ বাদে ৫০০-৬০০ টাকা আয় হচ্ছে বলে জানায় অনেক চটপটি ও ফুচকা বিক্রেতা।
বাংলাদেশে এখন অনেক গ্যাসের খনি অনাবিষ্কৃত আছে বলে মনে করেন অনেক মৃত্তিকা ও খনি বিশেষজ্ঞ। কিন্তু স্থানীয়ভাবে গ্যাসের সহজপ্রাপ্যতার সব সম্ভাবনাও সরকার নষ্ট করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। স্থলভাগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স বহু বছরব্যাপী গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন সফলতার সঙ্গে করলেও সম্প্রতি রাশিয়ার গাজপ্রম, আজারবাইজানের সোকারের মতো বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাসকূপ খননের কাজ করছে। যেখানে বাপেক্সের প্রতিটি কূপ খননে লাগছে ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা, সেখানে বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে নিচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা।
এছাড়া গ্যাসের দাম দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইনি যেসব প্রক্রিয়া আছে, সেখানেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শিথিলতা দেখিয়েছে। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর বেআইনি প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করেছে। কারণ, আইনে আছে একবার দাম বাড়ালে ১২ মাসের মধ্যে ফের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিইআরসিতে আসা যায় না। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করলেও গ্যাসের বাড়তি দাম গ্রাহককে দিতে হয়নি। এক বছরের জন্য সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সরকার দিয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, লাভে থাকলে বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না।
মূল কথা হলো গ্যাসখাত দুর্নীতিতে জর্জরিত। ২০১৮ সালে তিতাসে সংঘটিত দুর্নীতির কথা কারও অজানা নয়। সেসময় তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঘুষ ওজনে মেপে নিতে দেখা যায়।
আবাসিক গ্রাহকের গ্যাস প্রদানের ক্ষেত্রেও তিতাস বড় চাতুর্যের আশ্রয় নেয়। যাঁরা বাসায় দুই চুলা ব্যবহার করেছেন, তাঁরা বিল দিতেন মাসে ৮৫০ টাকা। তিতাস বাসাবাড়িতে ৮৮ ঘনমিটার গ্যাস গ্রাহক ব্যবহার করবেন এমন আন্দাজ করে (প্রতি মিটারের দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা ধরে এর সঙ্গে অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে) ৮৫০ টাকা বিল ধরেছে দুই চুলার জন্য। কিন্তু যাঁদের বাসায় মিটার রয়েছে, তাঁদের প্রতি মাসে ৪০০ টাকার মতো গ্যাস তাঁরা ব্যবহার করেন। রাজধানীতে সামান্য কিছু বাসায় তিতাস মিটার দিয়েছে। মোট ব্যবহৃত গ্যাসের ১৬ শতাংশ গ্যাসকে আবাসিকে ব্যবহার দেখানো হয়। তাহলে বাস্তবে আবাসিকে গ্যাস ব্যবহৃত হয় ৮ শতাংশ। এই ৮ শতাংশ আর চুরির ১২ শতাংশ বা সিস্টেম লস যদি যুক্ত করা হয়, তাহলে মোট চুরি করা গ্যাসের অর্থ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা প্রতি মাসে হয়। আর তা বছরে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এটি শুধু তিতাস অঞ্চলের হিসাব। চুরির সিংহভাগ যায় শিল্পকারখানায়। সামান্য কিছু চুরির গ্যাস বাসাবাড়িতেও ব্যবহার হয়। দীর্ঘদিন শিল্পে ইভিসি মিটার বসানোর দাবি খোদ শিল্পমালিকদের থেকে এলেও তিতাস সেই মিটার বসায়নি। কারণ, ইভিসি মিটার বসালে তিতাসের চুরি ধরা পড়ে যাবে। এ ছাড়া আবাসিকে প্রিপেইড মিটার বসানোর কাজ এতই ধীর যে বর্তমান গতিতে প্রিপেইড মিটার স্থাপন অব্যাহত থাকলে আগামী ১০০ বছরেও সেটি সম্পন্ন হবে না।
উল্লেখ্য, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত কমিশনে স্বপ্রণোদিত হয়ে ঘুষখোর কর্মকর্তারা নিজেদের সম্পদের বিবরণ দিয়েছিলেন। তিতাসের আত্মস্বীকৃত ঘুষখোর কর্মকর্তাদের কিছু হয়নি, বরং তাঁরা দেশের সব থেকে বড় এই প্রতিষ্ঠানের কাঁধে সিন্দবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছেন।