January 24, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, January 13th, 2022, 12:23 pm

গ্যাস ও বিদ্যুত খাতে ভর্তুকি দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ছে। এ নিয়ে বিপর্যয়ে পড়তে যাচ্ছে আবার মধ্যম ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। বিপাকে পড়েছে সরকারও। এই দুটি পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা না হলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থ সংকটের কারণে বিপুল অঙ্কের এই ভর্তুকি বহন করা সম্ভব নয়। এই ভর্তুকির বিপরীতে সরকারের চলতি বছরের বাজেটে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় দুই হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বিভাগকে দিয়েছে। এলএনজি আমদানি করতে সরকারের এখনই দরকার ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই বরাদ্দও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। সে কারণে গত নভেম্বরে অর্থ বিভাগের কাছে ৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা।

তবে বড় অংকের ভর্তুকির চাপ থেকে রেহাই পেতে সরকার প্রান্তিক পর্যায়ে প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এটি কার্যকর হলে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

জানা যায়, দারিদ্র্যের হার ৩০ শতাংশের বেশি এমন ৬০ উপজেলার দরিদ্র কর্মহীনদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচিতে পৃথক প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ও তার প্রভাব মোকাবেলায় করণীয় বিষয়ে একটি কৌশলপত্র উপস্থাপন করেছে অর্থ বিভাগ। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির সভায় প্রণোদনা দেয়ার এ পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পাশাপাশি সারের দাম বৃদ্ধির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সার, জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। মূল্যস্ফীতি ও জনসাধারণের ওপর বিরূপ প্রভাবের দিকটি বিবেচনায় রেখেই সবসময় এসব পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারণ করা হয়। সে কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তা পর্যায়ে মূল্য সহনশীল রাখতে এসব ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্য বা সেবার দাম বাড়লে মাঝেমধ্যেই দেশেও দাম বাড়ানো হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চলতি বাজেটে এসব ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ভর্তুকি রাখা হয়েছে, তা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। এতে বাজেট ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল হয়ে যাবে। এ ছাড়া আর্থিক খাত একটি বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে পারে। তাই এবার সার, এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর প্রস্তাব করেছে অর্থ বিভাগ। এরইমধ্যে ডিজেল, কেরোসিন, এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে।

তবে নিরাশার ভিড়ে একটি আশার সংবাদ এই যে, সরকার সারের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারটি নাকচ করে দিয়েছে। জানা যায়, সারে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে বরাদ্দের তিন গুণ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কভিড মহামারীর সময়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে আপাতত দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না সরকার।

সরকার চাইলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দামও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়ায় সরকার বিপাকে পড়েছে। আমদানি করা গ্যাস দিয়ে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যাতে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায়। বাংলাদেশের মানুষের বড় অংশ দরিদ্র। ফলে এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দরকার নেই। প্রয়োজনে লোডশেডিং করা হোক, তবুও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানো হোক।

বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতার বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ জ্বালানি সহকারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিমের ভাষ্য, ‘যে হারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজির) দাম বেড়েছে তাতে সরকারের বড় ভর্তুকি যাচ্ছে এই গ্যাস আমদানি করতে গিয়ে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কতটুকু বাড়াতে পারবে সরকার। গোটা লোকসান জনগণের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। এ খাতে অবশ্য ভর্তুকি থাকতে হবে। এ দুটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অধিক হারে বাড়লে তা জনগণের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’

বিদায়ী বছরের আগস্ট মাসের আগ পর্যন্ত প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার। সেটি বেড়ে এখন ৪৫ ডলার হয়েছে। সাড়ে চারগুণ দাম বেড়েছে এলএনজির স্পট মার্কেটে। দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করে সরকার। অর্থাৎ সরবরাহকৃত গ্যাসের তিন ভাগের একভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানির কারণে গ্যাস খাতে ভর্তুকি বেড়েছে।

গ্যাসের সাথে বিদ্যুতের সম্পর্ক নিবিড়। গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়বে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কারণ দেশের প্রায় ৭০ ভাগ বিদ্যুৎ আসে গ্যাস থেকে, বাকি বিদ্যুতের বড় অংশ আসে তেল থেকে। এর আগে সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে ২৩ ভাগ। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ঘাটতি মেটাতে এই প্রয়োজনীয় দুটি পণ্যের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে চায়।

এটি সবার জানা যে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একমাত্র পাইকারি বিদ্যুৎ কেনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সেই পাইকারি বিদ্যুৎ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিসহ (আরইবি) দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানির মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করা হয়। আর সঞ্চালন করে থাকে একমাত্র পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। পিডিবি সম্প্রতি পাইকারি বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে কী পরিমাণ লোকসানের মুখে পড়ছে তার একটা হিসাব করেছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন করবে। পিডিবির আবেদন করার পরই গ্রাহক পর্যায় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিইআরসির কাছে দাম বাড়ানোর আবেদন করবে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ যে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিছুদিন আগে বিপাক সৃষ্টি করেছিলজ্বালানি তেল। সেই সমস্যা কেটে উঠতে না উঠতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা এসে হাজির। সরকারের সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সহনীয় পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো উচিত।