January 31, 2023

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, January 5th, 2023, 9:44 pm

ঘাটতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ দেশের জ্বালানি খাতকে আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশের ৬টি কূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ বেড়েছে। চুক্তিভিত্তিক আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪ ডলার। আর ওই দর ধরে হিসাব করলে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের দাম দাঁড়ায় ৫৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। আর স্পট মার্কেট (খোলাবাজার) থেকে আমদানি করা প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দর ২৪.৭৫ ডলার ধরে হিসাব করা হলে দাম দাঁড়ায় ৯৭ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদ আছে। আর দেশে গ্যাসের বার্ষিক চাহিদা প্রায় এক টিসিএফ। যে কোনো কূপ থেকে মজুদ করা গ্যাসের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ উত্তোলন করা যায়। ওই হিসাবে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস ছিল প্রায় আট টিসিএফ। ওই উত্তোলনযোগ্য মজুদের সঙ্গে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হলো। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৪৬টি গ্যাসকূপ পুনঃখনন, অনুসন্ধান ও উন্নয়নের মাধ্যমে দৈনিক ৬১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। আর ওই পরিকল্পনার আওতায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) ৬টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে দৈনিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উত্তোলন বাড়িয়েছে। বর্তমান স্পট মার্কেটে (খোলাবাজার) এলএনজির দর বিবেচনায় ওই দৈনিক উত্তোলন করা গ্যাসের দাম ৮২ কোটি টাকার বেশি। তাছাড়া খননকাজ চলমান থাকা ৩টি কূপে সম্ভাব্য আরো ৩০৯.৫ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ আছে। ওই ৩টি কূপ থেকে সম্ভাব্য দৈনিক উৎপাদন ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ২ হাজার ৬৫০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তার মধ্যে দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে। বাকি ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে পূরণ করা হচ্ছে। আগে পেট্রোবাংলা চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ৩ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারতো। বর্তমানে বিশ্ববাজারে স্পট মার্কেট এলএনজির দাম বাড়ায় সরকার গত জুলাই মাস থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ রেখেছে। ফলে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর স্বল্পমেয়াদি ওই পরিকল্পনার আওতায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি অনেক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
সূত্র আরো জানায়, দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়ছে। ফলে গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র বাড়েনি। তাতে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। চাহিদা সামাল দিতে সরকারকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে যে খরচ হয়, এলএনজি আমদানিতে তার চেয়ে ৭ থেকে ১০ গুণ বেশি খরচ হয়। তাতে জ্বালানি বিভাগের ওপর ভর্তুকি চাপ বেড়েই চলেছে। বর্তমানে পুরনো কূপগুলো ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাপেক্স ওয়ার্কওভার, উন্নয়ন ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের আওতায় ৯টি কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধান করে। ইতোমধ্যে ৬টি কূপের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা গ্যাসক্ষেত্রের সালদা-২ ওয়ার্কওভার করে ৫.২৫ বিসিএফ উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ পেয়েছে। ওই কূপ থেকে ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দৈনিক গ্রিডে দেয়া হচ্ছে। সিলেট-৮ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের ৩২ বিসিএফ মজুদ পাওয়া গেছে। ওই কূপ থেকে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দৈনিক গ্রিডে দেয়া হচ্ছে। সিলেটের কৈলাসটিলা-৭ কূপে ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে ৪০ বিসিএফ। ওই কূপ থেকে দৈনিক ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেয়া হচ্ছে। বিয়ানীবাজার-১ কূপটি ওয়ার্কওভার করে গ্যাসের ৬১ বিসিএফ মজুদ পাওয়া যায়। সেখান থেকে দৈনিক গ্রিডে দেয়া হচ্ছে ৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। ভোলার শাহবাজপুর ইস্ট-১ অনুসন্ধান কূপে মিলেছে ৩৬.৮৯ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ। ওই কূপ থেকে ভোলায় সরবরাহ করা হচ্ছে দৈনিক ২২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের টকগী-১ অনুসন্ধান কূপটি উৎপাদনক্ষম করা হয়েছে। খুব শিগগিরই কূপটি উৎপাদনে যাবে। আর ওই কূপে মজুদের পরিমাণ ২৩৯ বিসিএফ এবং দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেওয়া যাবে। তাছাড়া বাকি ৩টি চলমান কূপের মধ্যে শ্রীকাইল নর্থ-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য গ্যাস মজুদের পরিমাণ ৪৫.৫ বিসিএফ। ওই কূপ থেকে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস গ্রিডে দেয়া যাবে। ভোলা নর্থ উন্নয়ন কূপটিতে ১৯১ বিসিএফ সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে এবং কূপটি থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে দেয়ার সম্ভাবনা আছে। আর শরীয়তপুর-১ অনুসন্ধান কূপে সম্ভাব্য ৭৩ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে এবং দৈনিক ১০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্রিডে দেয়া যাবে।
এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কূপ ওয়ার্কওভার ও অনুসন্ধানের উদ্যোগ খুবই জরুরি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুতই আরো ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে। তাছাগড়া পুরনো কূপ ওয়ার্কওভার ও উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন নতুন কূপ অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও জোর দেয়া প্রয়োজন। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। মূলত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও পেট্রোবাংলাকে ওই অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু স্পট এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় পেট্রোবাংলার বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। দেশে এখনো প্রচুর গ্যাস মজুদ রয়েছে। বিদ্যমান কার্যক্রম চলমান থাকলে সামনে এর সুফল আরো পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে নতুন কূপ অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলাকে আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়ে বাপেক্সকে কাজে লাগানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী জানান, ২০২২ সালে ৬টি কূপ পুনঃখনন ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ ৪১ হাজার ৪১৪ কোটি ঘনফুট বাড়ানো হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করে এলএনজি আমদানির চাহিদা কমানো হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো না গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হতো। বর্তমানে বাপেক্স স্থলভাগে কূপ খননে শতভাগ সক্ষম। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বাপেক্স নিজেদের কাজগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) গ্যাস ফিল্ডের ওয়ার্কওভার কাজগুলোও করে যাচ্ছে।