October 3, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, September 20th, 2022, 7:31 pm

চিশতি বাউলকে নিয়ে বিতর্ক

অনলাইন ডেস্ক :

পুরো নাম শামসেল হক চিশতি। শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন চিশতি বাউল নামে। দেশজুড়ে বহু বছর ধরে বাউল ও লোক গান করে আসছেন। তবে ব্যাপক পরিসরে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন বছর ছয়েক আগে ‘বেহায়া মন’ গেয়ে। গান বাংলা টিভির ফিউশন আয়োজনে গানটি গেয়েছিলেন চিশতি বাউল। তার কণ্ঠে প্রকাশিত ওই গানের ভিউ ছাড়িয়েছে ২৩ মিলিয়ন। এ ছাড়া আরও অনেকেই এই গানের কাভার করে সাফল্য পেয়েছেন। এরপর ‘যদি থাকে নসিবে’ শিরোনামের গানটি দিয়ে ফের নিজের মুনশিয়ানা জাহির করেন এই বাউল। এই গানটিও নেট দুনিয়ায় ঝড় তোলে। বিভিন্ন বয়সী শ্রোতা-শিল্পীর মাঝে ছড়িয়ে যায়। সেই চিশতি বাউল এখন মাছরাঙা টিভিতে প্রচার চলতি ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’য় প্রতিযোগীর ভূমিকায়! অডিশন, গ্রুমিং, পেরিয়ে স্টুডিও রাউন্ডে লড়াই করছেন অন্যান্য সাধারণ প্রতিযোগীর সঙ্গে। ইতোমধ্যে তার পারফর্মেন্সের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। যা দেখে অবাক, বিস্মিত অনেকেই। প্রায় তিন যুগ ধরে যিনি নিয়মিত স্টেজে বাউল গান করছেন, খ্যাতিও পেয়েছেন, তিনি কেন একটি টিভি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নামলেন? বিষয়টি জানার জন্য যোগাযোগ করা হয় চিশতি বাউলের সঙ্গে। তিনিবললেন, ‘ফেসবুকে যে আলোচনা হচ্ছে, এটা আসলে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। আমি কোনও সমস্যায় পড়ে প্রতিযোগিতায় যাইনি। গিয়েছি শুধু আমার গানগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য। যাতে তরুণরা সঠিকভাবে গাইতে পারে। তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটালাম, আনন্দ করলাম। এরপর ইচ্ছে হলো, চলে আসলাম।’ বাউল জানান, প্রতিযোগিতা থেকে তিনি ইতোমধ্যে চলে গিয়েছেন সাভারে। মনের পাগলামি থেকে এতে অংশ নিয়েছিলেন। একই ভাবনায় চলেও গেলেন। গুণী এই শিল্পীর ভাষ্য, ‘একবার টিভিতে দেখলাম আমার গান এক শিল্পী ভুল সুরে গাইছে। সেরকম যাতে না হয়, তাই এই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম!’ এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে বলাবলি করছেন, হয়তো কোনও সমস্যায় পড়ে এই পথে পা বাড়িয়েছেন চিশতি। আবার তাকে ঘিরে রয়েছে নানা মাত্রার নেতিবাচক সমালোচনাও। এ বিষয়ে চিশতি বাউল বলেন, ‘না, আমি কোনও সমস্যার মধ্যে নেই। রিজিকের মালিক আল্লাহ। গানের পাশাপাশি আমি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, কৃষি কাজ, দোকানদারি অনেক কিছুই করি।’ গানবাজনা কেমন চলছে এখন? প্রশ্ন শুনে এই শিল্পীর জবাব, ‘গানের জন্য আমি দৌড়ঝাঁপ করি না। বসে থাকি, কারণ যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে।’ এদিকে অনেকেই বলাবলি করতে চাইছেন, ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র এবারের আসরটিকে আলোচনায় আনার লক্ষ্যেই বিচারকের আসনে না বসিয়ে প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড় করানো হয়েছে এই নন্দিত বাউলকে! যদিও আয়োজন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে মিলেছে বেশ কিছু বিস্ময়কর তথ্য। মাছরাঙা টেলিভিশনের ডেপুটি ম্যানেজার (প্রোগ্রাম, ক্রিয়েটিভ ইনচার্জ) এবং ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানার’ স্ক্রিপ্ট রাইটার রুম্মান রশীদ খানবলেন, ‘চিশতি বাউল জনপ্রিয় ও গুণী মানুষ। এতে সন্দেহ নেই। ফলে তার সম্মানহানি হোক কিংবা তার নাম বিক্রি করে আমরা কোনও প্রচারণা চাই- সেটা কখনই মাছরাঙা কর্তৃপক্ষ সমর্থন করে না।’ ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র সঙ্গে শুরু থেকে সরাসরি জড়িত থাকা এই কর্মকর্তা জানান, চিশতি বাউল নিজ উদ্যোগেই এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। যেটা তিনি আগেও লিখিয়েছিলেন, কিন্তু সেবার তিনি হাজির হতে পারেননি। এই তথ্যটিও এবারই জানান চিশতি। তবে এবার তিনি যথাসময়ে অডিশন রাউন্ডে হাজির হন। এবং সাধারণ নিয়মেই অংশ নিয়ে সকল ধাপ পার করে স্টুডিও রাউন্ডে ঢাকার ক্যাম্পে যোগ দেন। রুম্মান বলেন, ‘‘ওনাকে প্রতিযোগী হিসেবে পেয়ে আমাদের বিচারক বা গ্রুমাররা বিব্রত বোধ করেন। বার বার তাকে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছে, আয়োজনটি অনেক দীর্ঘ ও নিয়ম-কানুনে বাঁধা। তিনি বলেছেন, ‘আমার অনেক শখ এমন আয়োজনে সবার সঙ্গে গান করার। আমার কোনও সমস্যা নেই।’’ গ্রুমিং সেশনে অনেক বিচারক চিশতি বাউলকে এটাও বলে বুঝিয়েছেন, ‘‘আমরা নিজেরাই আপনার গানের ভক্ত। ফলে বিচারকের আসনে বসে আপনার গানের ভুল ধরা আমাদের জন্য বিব্রতকর। এর জবাবে বাউল বলেছেন, ‘আপনারা যেভাবে জাজ করেন সেভাবেই করবেন। আমার আপত্তি নাই। তবুও আমি এই প্রতিযোগিতায় লড়তে চাই।’’ এভাবে ঢাকায় ক্যাম্পে থেকে স্টুডিও রাউন্ডের প্রায় ১১টি পর্ব ধারণ করা হয়। এরমধ্যে তৈরি হয় চিশতি বাউলকে ঘিরে নানা জটিলতা। কারণ, ক্যাম্পে সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠতে হয়। আবার রাত ১২টা বাজেও রিহার্সাল-রেকর্ডিং চলে। ফলে এসব বিষয়ে চিশতি বাউল অ্যাডজাস্ট করতে পারছিলেন না। তিনি বাড়ি ফিরে যেতে চাইছিলেন তার স্ত্রীদের কাছে। জানা গেছে, এই বাউলের চারজন স্ত্রী। তিনি বার বার তার স্ত্রীদের সঙ্গে দেখার অনুরোধ করছিলেন। যেটা ক্যাম্পের গ্রুমিং সেশনে সম্ভব ছিলো না। রুম্মান রশীদ খান বলেন, ‘এমন একপর্যায়ে তিনি (বাউল) বাড়ি ফেরার কথা বললেন অথবা তার স্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন- তখন আসলে আমাদের শোয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গ হচ্ছিলো। কারণ, উনি তো একক নন- একটা গ্রুপের সদস্য হয়ে এখানে অংশ নিয়েছেন। ফলে উনি হুট করে চলে গেলে সেই গ্রুপটি অপারেট করা মুশকিল। তবুও বিশেষ বিবেচনায় তাকে বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। বাড়ি থেকেই এখন তিনি অংশ নিচ্ছেন। যদিও এটা অনুষ্ঠান অপারেশনের জন্য বিপদজনক। তবুও তার সম্মানে এতটুকু করতে হয়েছে আমাদের।’ কিন্তু চিশতি বাউল তো বললেন, তিনি প্রতিযোগিতা ছেড়ে গিয়েছেন! জবাবে মাছরাঙা কর্তৃপক্ষ জানায়, স্টুডিও ছেড়ে বাড়ি গেছেন এই বাউল। কিন্তু প্রতিযোগিতায় তিনি এখনও আছেন। যার মাত্র তিনটি পর্ব সম্প্রচার হয়েছে। বাকি রয়েছে আরও ৮ পর্ব। এই পর্বগুলো প্রচারের পরই আসলে স্পষ্ট হবে চিশতি বাউল পরের রাউন্ডে থাকছেন না ছিটকে পড়ছেন। ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’র সঙ্গে জড়িত একাধিক শিল্পী-প্রযোজক জানালেন, চিশতি বাউল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরো আয়োজনটিতে নতুন মাত্রা দেওয়ার বদলে আরও জটিল করেছেন। যা অপ্রত্যাশিত ছিলো তাদের কাছে। কারণ, তিনি নিজের গানের বাইরে অন্যের গানে প্রায়ই অচল। যা একটি গানের প্রতিযোগিতার জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, লোকগান নিয়ে দেশের অন্যতম আয়োজন ‘ম্যাজিক বাউলিয়ানা’। বর্তমানে এটির চতুর্থ আসর চলছে। এবার মূল বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন বাউল শফি ম-ল, শাহনাজ বেলি ও আরিফ দেওয়ান। সারা দেশের ৫০ হাজারের বেশি প্রতিযোগী প্রাথমিক নিবন্ধন করেছিলেন। তবে মূল পর্বে জায়গা পেয়েছেন মাত্র ১৮ জন শিল্পী। এরমধ্যে ৬ জন করে তিনটি গ্রুপে সাজানো হয়েছে স্টুডিও রাউন্ড। যার একটি গ্রুপে আছেন চিশতি বাউল।