May 25, 2024

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, March 4th, 2024, 9:40 pm

তীব্র গ্যাস সঙ্কটেও বিপুল অর্থে সঞ্চালন লাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে বর্তমানে তীব্র গ্যাস সঙ্কট বিরাজ করছে। এর মধ্যেই গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) গ্যাসের সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য মোট নয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ওই নয় প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। মূলত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে গ্যাস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে চারটির কাজ চলমান রয়েছে। বাকি পাঁচটির অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। আর অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে পরিকল্পনা কমিশনে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং জিটিসিএল সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নয়টি গ্যাস সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৬১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। চারটি প্রকল্পে বর্তমানে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। বাকি আরো পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন জোগাড়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি ও স্থানীয় গ্যাস দিয়ে দৈনিক সরবরাহ হচ্ছে ৩০০ কোটি ঘনফুট। প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকছে ১০০ কোটি ঘনফুটের মতো।

এ ঘাটতি কাটাতে এরই মধ্যে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি কয়েকটি এলএনজি আমদানি চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। তবে এখনো গ্যাসের অনুসন্ধান চালিয়ে নিকট ভবিষ্যতে সরবরাহ বাড়ানোর মতো আশা জাগানো কোনো ফলাফল মেলেনি। আবার এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংশয়। গ্যাসের জোগান নিয়ে এ অনিশ্চয়তা দূর করার আগেই সঞ্চালন লাইন নিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে জিটিসিএল। গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশায় এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে বড় বিনিয়োগে দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে এখনো এসব পাইপলাইনে পর্যাপ্ত গ্যাস যায়নি। এর মধ্যেই আবারো নতুন করে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে এসব প্রকল্পে লাভবান হওয়া না গেলে জ্বালানি খাতের ভোগান্তি আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস সঞ্চালন লাইন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা জিটিসিএল এখনো লোকসানে রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুধু গ্যাস সঞ্চালন করে সংস্থাটি সিস্টেম লস করেছে ৫০০ কোটি টাকা। আর ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণসহ ওই অর্থবছরে জিটিসিএলের মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকারও বেশি।

সূত্র জানায়, নয় প্রকল্পের অন্যতম ‘বাখরাবাদ-মেঘনাঘাট-হরিপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন’ প্রকল্পটির কাজ ২০২১ সালে শুরু হয়। এর আওতায় কুমিল্লা জেলার বাখরাবাদ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলার মেঘনাঘাট হয়ে হরিপুর পর্যন্ত ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। ১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকার এ প্রকল্প চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আর এ প্রকল্প শেষ না হওয়ায় মেঘনাঘাটে ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তিনটি গ্যাসভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের জোগান না পাওয়া এসব কেন্দ্র আট মাস আগে প্রস্তুত হলেও তা চালাতে পারছে না বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

বাস্তবায়নাধীন আরেক প্রকল্প ‘বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের’ কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে নেয়া প্রকল্পটি গত বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জিটিসিএল তা করতে পারেনি। ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন ও আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আর প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৭০ কোটি টাকায়। তাছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মিত ও নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক গ্রাহকের গ্যাস সুবিধা দিতে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর পূর্বপাড় ভাল্ব স্টেশন থেকে পশ্চিমপাড় ভাল্ব স্টেশন পর্যন্ত ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ১০ কিলোমিটার একটি পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের লক্ষ্য মূলত দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করা। ২৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন ব্যয় বেড়ে ৪৪৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়ে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তাছাড়া গ্যাসের উৎপাদন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ইনটেক পয়েন্টে গ্যাস পৌঁছে দেয়ার জন্য আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে জিটিসিএল। এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সঞ্চালন লাইনের ইনটেক ও অফটেক প্রান্তে গ্যাস পরিমাপের জন্য মিটার বসাচ্ছে সংস্থাটি। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকার এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।

চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। জিটিসিএলের নিজস্ব অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। জিটিসিএলের বাস্তবায়নাধীন এ চার প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। ২১০ কিলোমিটার এ পাইপলাইন প্রকল্পে জিটিসিএল ছাড়াও বিভিন্ন দাতা সংস্থার বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন রয়েছে। সূত্র আরো জানায়, জিটিসিএল দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৭০-৭৫ শতাংশ পরিবহন করে। আর গ্যাস সঞ্চালন করে যে চার্জ পায় এটিই কোম্পানির একমাত্র আয়। পেট্রোবাংলার ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৮টি কূপ খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরো ৬১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

মূলত এসব পরিকল্পনাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক জোনগুলোকে গ্যাস গ্রিডের আওতায় আনতে চায় পেট্রোবাংলা। এজন্যই পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জিটিসিএল বর্তমানে পাঁচটি প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে দেনদরবার করছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো পায়রা-বরিশাল-গোপালগঞ্জ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন প্রকল্প। এর আওতায় দেশের পটুয়াখালীর গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রা থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করবে জিটিসিএল। ১৫৩ কিলোমটার এ লাইন নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চায় জিটিসিএল।

২০২৩ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অর্থায়ন সংকটে এখনো তা শুরু করা যায়নি। তাছাড়া মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির পায়রায় একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা রয়েছে। ৫০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার এ টার্মিনাল নির্মাণের কাজ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এখনো এ টার্মিনাল নির্মাণ চুক্তি করতে পারেনি পেট্রোবাংলা। এ উদ্যোগকে সামনে রেখে কুয়াকাটা থেকে পায়রা পর্যন্ত সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করতে চায় জিটিসিএল। ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পের কাজ আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত করা যায়নি। তাছাড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবাহের জন্য নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ থেকে মাওয়া হয়ে জাজিরা-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ গ্যাস সঞ্চালনে আরেকটি পাইপলাইন নির্মাণ করতে চায় জিটিসিএল।

এ প্রকল্পের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। আর দেশের জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আনতে চায় সরকার। কিন্তু ভোলার সঙ্গে মূল ভূখন্ডে কোনো পাইপলাইন না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র থেকে ভোলা নর্থ (গ্যাসক্ষেত্র) হয়ে লাহারহাট-বরিশাল গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ পাইপলাইনে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনতে সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পে এখনো অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি জিটিসিএল।

পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গ্যাসভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য খুলনা থেকে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় জিটিসিএল। এ পাইপলাইনের মাধ্যমে মূলত খুলনা ও গোপালগঞ্জ জেলার আশপাশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এদিকে পরিকল্পনাধীন প্রকল্পের বিষয়ে জিটিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রজেক্ট প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং বিভাগ) মো. মশিহুর রহমান জানান, পাইপলাইন নিয়ে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রকল্পগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

কারণ অর্থায়ন নিশ্চিত না করে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো যায় না। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে চেষ্টা চলছে, নিশ্চিত হওয়া গেলেই কেবল অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। অন্যদিকে এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান জানান, সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ করতে হলে গ্যাসের সঞ্চালন নেটওয়ার্ক জরুরি। এটি করতে হলে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। শিল্পায়ন হতে হলে গ্যাস-বিদ্যুতের প্রয়োজন। গ্যাসের ক্ষেত্রে এটা করতে হলে পাইপলাইন জরুরি। পর্যায়ক্রমে এটি করতে হবে।