August 19, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, December 27th, 2021, 9:36 pm

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মূলত গ্যাসলাইনের ক্ষেত্রে লিকেজ (ছিদ্র) ও সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে ব্যবহারে অসচেতনতাই বড় বিপদ হয়ে দেখা দিচ্ছে। আর তদারক সংস্থাগুলোর দায়িত্বে গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনায় ওই বিপদ দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে মনিটরিং জোরদার করে গ্যাসজনিত দুর্ঘটনার হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বিগত ৩ বছরে গ্যাস, এলপিজি গ্যাস ও সিলিন্ডার থেকে অন্তত ২ হাজার ১৫২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর ওসব দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি। তাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৭ জন এবং আহত হয়েছে ৪৩৯ জন। বড় দুর্ঘটনার পর কিছুটা তোড়জোড় হলেও কিছুদিন গেলেই তা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস এবং বিশেষজ্ঞদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বদ্ধ রুমে মিথেন গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতির কারণেই গ্যাসজনিত দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় মিথেনের সঙ্গে হাইড্রোজেন সালফাইড যুক্ত হয়ে গ্যাস বিস্ফোরণকে আরো শক্তিশালী করে। ওসব বিস্ফোরণে বিপুলসংখ্যক হতাহতের পাশাপাশি ভবন ধসে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। চলতি বছরে গ্যাস থেকে এমন কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ, তাপ ও ছিদ্র থেকেই দুর্ঘটনা ঘটছে।
সূত্র জানায়, দিন দিন গ্যাসজনিত দুর্ঘটনার হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গত ৩ বছরে গ্যাস, এলপিজি গ্যাস ও সিলিন্ডার থেকে অন্তত ২ হাজার ১৫২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। আর তাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৬৭ জন এবং আহত হয়েছে ৪৩৯ জন। তার মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গ্যাস থেকে অন্তত ৫৩৭টি অগ্নিকান্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তাতে অন্তত ১৭ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। আর ওসব দুর্ঘটনায় অন্তত ২১৭ জন আহত এবং ২৬ জন নিহত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী গত ১৫ বছরে অগ্নিদুর্ঘটনায় ২ হাজার ৩১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৪ জন। আর তাদের বড় অংশই গ্যাস দুর্ঘটনার শিকার।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০২০ সালে গ্যাস সরবরাহ লাইন ও সিলিন্ডার থেকে অন্তত ৭৯৭টি দুর্ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে ৫৩৪টি দুর্ঘটনাই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলো ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। ওসব দুর্ঘটনায় আনুমানিক ২৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ওই দুর্ঘটনাগুলোতে ১৬ জন নিহত এবং ১৫৩ জন আহত হয়। তার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ লাইনের আগুনে আহত হয় ৪০ জন ও নিহত হয় ৪ জন। গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় ৬৭ জন আহত হয় এবং নিহত হ ৬ জন। গ্যাস থেকে অগ্নিকান্ড ছাড়া বিস্ফোরণসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় ৪৬ জন আহত এবং ৬ জন নিহত হয়। তাছাড়া ২০১৯ সালে গ্যাস, এলপিজি গ্যাস ও সিলিন্ডার গ্যাস থেকে অন্তত ৮১৮টি অগ্নিকান্ড ও বিস্ফোরণ হয়। তার মধ্যে ৩৭২টি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে যুক্ত হতে হয়েছে। বছরটিতে গ্যাস থেকে অগ্নিকান্ডে মোট ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ১২ কোটি ১৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। ওসব অগ্নিদুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৯ জন এবং নিহত হয়েছে ২৫ জন। ওই বছর ঢাকায় সর্বোচ্চ ৫৪৮টি এবং বরিশাল ও সিলেটে সর্বনিম্ন ৭টি করে গ্যাস থেকে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে গ্যাসজনিত বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ড কমিয়ে আনা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দুর্ঘটনাগুলোর আগে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি মিথেন গ্যাস জমা হয়। মিথেন গ্যাস দাহ্য পদার্থ। বদ্ধ রুমে বাতাসে ৫-১৫ শতাংশ অথবা তার চেয়ে বেশি মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে কোনো স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ), ম্যাচের কাঠি বা আগুনের উৎস থাকলেই বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় মিথেনের সঙ্গে যুক্ত হয় হাইড্রোজেন সালফাইড। যা নিজে দাহ্য না হলেও অক্সিজেনের উপস্থিতিতে দাহ্য হয়। মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইড এক হয়ে দাহ্যতা বেড়ে যায়। ফলে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হয়। তবে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করলে যেসব উৎস থেকে গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটছে তার সবগুলোই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সাধারণত ওই বিস্ফোরণের উৎস হলো গ্যাস সিলিন্ডার ও লাইনের গ্যাস। সেগুলোর লিকেজসহ অন্যান্য দুর্বলতা দূর করতে হবে। পাশাপাশি যেই উৎসগুলো থেকে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে, তার তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি আছে। সেগুলোর পরিপূর্ণ ডাটাবেজ নেই। ফলে নিয়মিত মনিটরিং হয় না। কোথাও কোথাও কখনোই মনিটরিং হয় না। সেজন্য একটা পরিপূর্ণ ডাটাবেজ এবং এর একটা ম্যাপিং থাকা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তাহলে পরিদর্শকদের তদারকিতে ঘাটতি হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে হায়ার অথোরিটির কাছে বার্তা আসবে। পাশাপাশি ওই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে তাদের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গ্যাস থেকে দুর্ঘটনা রোধে ইতিমধ্যে ৬টি সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে ওই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের তিতাস গ্যাসের ভূগর্ভস্থ পুরোনো লাইনগুলো পরিবর্তন করে নতুনভাবে বিন্যাস করতে হবে। কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের সময় ভূগর্ভে গ্যাসলাইন নেই- তিতাস গ্যাস থেকে এমন সার্টিফিকেট নিতে হবে। সিটি করপোরেশনের ড্রেইন মেরামতকালে গ্যাসলাইন যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। গ্যাসলাইন লিকেজ বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা জানতে তিতাসকে লাইনগুলো নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। লিকেজ পেলে সঙ্গে সঙ্গে মেরামত করতে হবে। বাসা-বাড়ি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও রান্নাঘরে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গ্যাস লিকেজ থাকলে কোনোভাবেই বৈদ্যুতিক সুইচ, মশা মারার ব্যাট, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না, ধূমপান করা যাবে না। ঢাকা শহরে যেসব সুয়ারেজ লাইন আছে সেখানে যাতে গ্যাস লিকেজ হয়ে ওই লাইনের গ্যাসের সঙ্গে না মিশতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন জানান, লাইনের গ্যাসের ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ সংযোগই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। গ্যাসের যে লাইনগুলো আছে তার বেশির ভাগই পুরোনো। ওসব লাইন থেকে গ্যাস বের হয়ে বাতাসে মিশে তা এক্সপ্লোসিভ (বিস্ফোরক) হয়ে যায়। তখন তাতে একটা স্পার্ক (স্ফুলিঙ্গ) পেলেই ঘটে দুর্ঘটনা। গ্যাস যতো বেশি জমা হবে তার ভয়াবহতাও ততো বাড়বে। আর সিলিন্ডার গ্যাসের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে প্রধানত মানহীন রেগুলেটর থেকে গ্যাস বের হয়ে। দীর্ঘক্ষণ গ্যাসের মধ্যে থাকায় অভ্যন্ত হয়ে যায় বলে লিকেজের বিষয়টি অনেকে বুঝতে পারে না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। তার থেকে উত্তরণে গ্যাসলাইনের ম্যাপিং প্রয়োজন। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ লাইন মেরামত, মানসম্পন্ন সামগ্রীর ব্যবহার, অটো শাটডাউন সিস্টেম চালু অতীব জরুরি।