September 28, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, September 4th, 2022, 9:52 pm

দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও কমে গেছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ। কারণ দেশে আসছে না বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের অর্থ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭৫ কোটি ডলার বা ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ কম। অথচ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বছর বাইরে গেছে ৬ লাখ ৩০ হাজার শ্রমিক। আর চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই বিদেশে গেছে আরো ৬ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক। তারপরও রেমিট্যান্স কমার বিষয়টি আশঙ্কাজনক। মূলত ডিজিটাল হু-ির কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হু-ি চক্রের সদস্যরা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রবাসীদের থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে নিচ্ছে। আর এ অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে কিছু অসাধু এজেন্ট। সেজন্য ইতোমধ্যে কয়েকটি এমএফএস প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৪১৯ এজেন্টশিপ বাতিল করেছে। পাশাপাশি নগদ ডলার অবৈধ গেমিং, বেটিং বা জুয়া এবং অনলাইনে বৈদেশিক মুদ্রার বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ ব্যাপারে বিস্তারিত তদন্তে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, একটি চক্র অবৈধভাবে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন এমএফএস প্রতিষ্ঠানের নামে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশে বিভিন্ন এমএফএসের সাইনবোর্ড টানিয়ে প্রবাসীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশি দূতাবাস ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সিআইডিতে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ডিজিটাল হু-ি চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশি এজেন্টের কাছে অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসীদের সুবিধাভোগীর এমএফএস অ্যাকাউন্ট নম্বর ও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে এসএমএস পাঠাচ্ছে। আর এখানকার এজেন্ট সুবিধাভোগীর নম্বরে ক্যাশ ইন করে দিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে আসছে না প্রবাসীদের অর্থ।
সূত্র জানায়, অনলাইন গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোট্রেডিং বা অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে এমএফএস এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ওই প্রক্রিয়ায় কিছু অসাধু এমএফএস এজেন্টের কাছে এসে ক্যাশ আউট করে খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে অনলাইন সাইটের পরিচালনাকারীদের কাছে পাচার করে দিচ্ছে। ভারত ও চীন থেকে পরিচালিত হচ্ছে ওই ধরনের বেশিরভাগ সাইট। ফলে দেশে তীব্র হচ্ছে ডলার সঙ্কট। তাতে ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারেও অনেক বেড়ে গেছে ডলারের দর। মূলত চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় ডলারের দর বেড়েছে। আর তার প্রভাবে বেড়েছে বাজারে পণ্যমূল্য।
সূত্র আরো জানায়, বিএফআইইউ এমএফএস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ডিজিটাল হুন্ডি এবং অবৈধ গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোট্রেডিং বা অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিং-সংক্রান্ত লেনদেন চিহ্নিত করতে মোট ৪ লাখ এমএফএস এজেন্টের তথ্য বিশ্নেষণ করেছে। ৪টি নির্দেশকের ভিত্তিতে গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের লেনদেন বিশ্নেষণ করে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫০৫টি সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করা হয়। ওসব নির্দেশকের একটি হলো- যেসব এজেন্ট নম্বরের মোট লেনদেনের ৯০ শতাংশ বা তার বেশি শুধু ক্যাশ ইন হয়েছে। অন্য নির্দেশকের মধ্যে রয়েছে- মোট লেনদেনের ৯০ শতাংশের বেশি যেখান থেকে শুধু ক্যাশ আউট হয়েছে, এক মিনিটে চারটি বা তার বেশি ক্যাশ ইন এবং রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে ক্যাশ ইন। এভাবে বিকাশের ৬৯ হাজার ৬১৩টি, উপায়-এর ৩৮ হাজার ৮৩৫টি, রকেটের ৩৮ হাজার ৩৫৮টি এবং নগদের ৩৪ হাজার ৩৫৮ এজেন্টকে প্রাথমিকভাবে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তারপর সংশ্লিষ্ট এমএফএস প্রতিষ্ঠানের কাছে ওসব এজেন্টের তথ্য দিয়ে অধিকতর বিশ্নেষণ করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ওই প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ হাজার ৮৯ জনের এজেন্টশিপ বাতিল করেছে। তার বাইরে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত আরো ৩৩০টি এজেন্টের এজেন্টশিপও বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাতিল হওয়া ৫ হাজার ৪১৯ এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সিআইডিতে তথ্য দেয়া হয়েছে।
এদিকে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভিন্ন এমএফএসের এজেন্টশিপ নিয়েছে হুন্ডি চক্রের সদস্যরা। তাদের কাছে বিদেশ থেকে শুধু টাকার পরিমাণ ও নম্বর উল্লেখ করে নির্দেশনা আসে। ওই আলোকে সুবিধাভোগীর নম্বরে এখান থেকে অর্থ পরিশোধ হয়। দ্রুততম সময়ে সুবিধাভোগীর নম্বরে টাকা পৌঁছে দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে হুন্ডি কারবারিরা সাধারণত কোনো ধরনের সার্ভিস চার্জ নেয় না। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে যেখানে গড়ে ৪ শতাংশের মতো খরচ হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় দর হু-িতে বেশি দেয়া হয়। হুন্ডি কারবারিদের আউটলেট বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার কাছে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা বাসা থেকে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসে। কখনো কখনো প্রবাসীর পক্ষে অগ্রিম অর্থ পাঠিয়ে দেয়। ওই রকম নানা সুবিধার কারণে অনেক প্রবাসীই হুন্ডিতে ঝুঁকছে। ফলে বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ বাড়লেও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বিকাশের চিফ এক্সটার্নাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বিকাশ নীতিমালাবহির্ভূত যে কোনো লেনদেন প্রতিরোধে বিকাশ সবসময় কার্যকারী ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর নীতিমালা মেনে নিয়মিত লেনদেন তদারকি ও মাঠ পর্যায়ে যাচাই করা হয়। প্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিবারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য প্রথা অনুযায়ী উত্থাপন করা াহয়। হুন্ডি প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বর্তমান উদ্যোগেও বিকাশ সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
একই প্রসঙ্গে নগদের হেড অব কমিউনিকেশন মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সজল জানান, নগদ ডিজিটাল হুন্ডির বিরুদ্ধে সব সময় স্বোচ্চার রয়েছে নগদ। সর্বোচ্চ সতর্কতার মাধ্যমে যে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধে নগদ বদ্ধপরিকর। নগদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে কোনো এজেন্ট থেকে হঠাৎ করে লেনদেন অনেক বাড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাল সংকেত পাওয়া যায়। লেনদেন কেন হঠাৎ বাড়ল তা যাচাই করে সেখানে কোনো অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হলে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং (এসটিআর) করা হয়।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ইকোনমিকস ক্রাইম স্কয়াডের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির জানান, বিএফআইইউ থেকে একটি প্রতিবেদন তাঁরা পেয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই সিআইডি ডিজিটাল হুন্ডি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। এখন সুবিধা হলো। সন্দেহজনক এজেন্টের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের আলোকে তথ্য-প্রমাণ পেলে মামলা দায়েরসহ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।