May 21, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, April 4th, 2022, 9:06 pm

নানাবিধ কারণে এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে দেশের নৌপথ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নানাবিধ কারণে এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে দেশের নৌপথ। প্রতি বছর নদীপথে চলাচল করতে গিয়ে অকালে ঝরে অনেক প্রাণ। বিগত ৭ বছরে দেশে ৪ হাজার ৭৯১টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাতে ৪ হাজার ২৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর আহত হয়েছে ১ হাজার ৭১৪ জন। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি নৌ-দুর্ঘটনা ও মৃত্যু হয়। আর সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দখল-দূষণে ইতিমধ্যে দেশের বহুসংখ্যক নদ-নদী নাব্য হারিয়ে ধুঁকছে। নৌ-ব্যবস্থাপনায়ও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই। তারপরও ব্যয়সাশ্রয়ী নদীপথই এখনো লাখ লাখ মানুষের যোগাযোগ ও চলাচলের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অদক্ষ চালক, যান্ত্রিক ত্রুটি, নৌযান চালনায় প্রতিযোগিতা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুমতি ছাড়াই নতুন ইঞ্জিন লাগানো, নৌযান চালনায় নিয়মভঙ্গসহ নানাবিধ কারণে নৌপথ এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ই নৌপথে ঘটছে বড়োসড়ো দুর্ঘটনা। যাত্রীদের নিরাপত্তায় লঞ্চে লাইফ জ্যাকেট বা লাইফ বয়া কম থাকা, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম না থাকা, বাকেটে পানি বা বালি যাত্রীরা জরুরি প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে নৌ-দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
সূত্র জানায়, দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন নৌপথে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করে বেশি ভাড়া আদায়ের হিসাব কষতে গিয়ে লঞ্চ মালিকরা ঝুঁকি নিয়েই নৌ-চলাচলে সায় দিচ্ছে। আর তাতেই ঘটছে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি দুর্ঘটনার তদন্ত কাজ শেষ হতে না হতেই নতুন কোনো দুর্ঘটনা সেটিকে চাপা দেয়। নৌপথের এমন অব্যবস্থাপনা নিরসনে মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা বিভিন্ন সময় আশ্বাসের কথা শোনালেও কার্যত অবস্থার কোনো উন্নতি বা পরিবর্তন নেই। দেশে ২০১৬ সাল থেকে যেসব লঞ্চ দুর্ঘটনার প্রায় ৫৪ শতাংশই অন্য নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাক্কা লেগে ঘটেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৩ শতাংশ, বাকি ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনা অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, লঞ্চের তলা ফেটে, যান্ত্রিক ত্রুটি, আগুন ও বিস্ফোরণের কারণে ঘটেছে।
সূত্র আরো জানায়, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর কেটে গেলেও দেশে এখনো নৌ-চলাচলে সময়োপযোগী ও কার্যকরী কোনো আইন নেই। ১৯৭৫ সালের পর দেশে অভ্যন্তরীণ জলসীমায় নিরাপদ ও দুষণমুক্ত নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে ‘দ্য ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তারপর প্রায় ৪৭ বছর কেটে গেলেও এখনো ওই আইন দিয়েই চলছে দেশের নৌপরিবহন। একের পর এক নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটলেও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এখনো নৌপথের জন্য নতুন আইন চূড়ান্ত করতে পারেনি। বরং একাধিকবার আইনের খসড়া তৈরি করে এখনো ‘অভ্যন্তরীণ নৌ০চলাচল আইন, ২০২১’ নামে একটি খসড়া আইন প্রণয়নের মধ্যেই তা আটকে রয়েছে। খসড়া আইনটির ৭৩ ধারায় অপরাধ ও দ-ের বিষয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর পর্যন্ত কারাদ- বা ৩ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দ-ের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৮০ ধারায় কোম্পানির পরিচালকদেরও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দায়ী করে শাস্তি দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে মালিকপক্ষের দ্বিমত থাকায় আইনটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আবার শুধু সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া গেলেও লঞ্চ বা জাহাজের সার্ভে সার্টিফিকেট দেয়া ব্যক্তি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের অবহেলার ক্ষেত্রে আইনটিতে কোনো শাস্তি বা সাজার বিধান রাখা হয়নি।
এদিকে নৌ-দুর্ঘটনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যাতায়াতের অন্য যে কোনো মাধ্যমের চেয়ে নৌপথে দুর্ঘটনা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাতে জানমালের ক্ষতিও বেশি হয়। ফলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন, দুর্ঘটনার কারণ ও কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে সেসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে একটা কার্যকর ও আলাদা আইন জরুরি। আর তা হচ্ছে না বলেই নৌপথে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। যে মানসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত করার কথা তা এদেশে হচ্ছে না। যে কারণে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই একটা গ্রুপকে দোষারোপ করা হয়। অথচ প্রকৃতপক্ষে যারা দায়ী তারা তদন্ত কমিটি বলয়েই থাকে। পরোক্ষভাবে যারা জড়িত তারাও কমিটিতে থাকে। সেজন্যই আইন এমন হতে হবে যে, তদন্ত কমিটিতে কারা থাকবে, তারা কী ভূমিকা রাখবে সেগুলোর সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকবে। নৌ-দুর্ঘটনা রোধে মনিটরিং আরো জোরদার করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে আইনে দায়ীদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা, আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচতেনতা বাড়ানোও জরুরি।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, অতিরিক্ত যাত্রী ও ভাড়া আদায়, ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সার্ভে সনদ ও রুট পারমিট প্রদান, অদক্ষ চালকসহ নানা কারণে নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটে। বাসের মতো লঞ্চেও মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিন বা বডি নিয়ে অসংখ্য যাত্রীর জীবন নিয়ে খেলছে লঞ্চ মালিক ও চালকরা। বছর বছর লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হলেও যাত্রীসেবা ও যাত্রীদের নিরাপত্তার দিকে নজর নেই। ফলে নৌপথে মৃত্যুঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই অনেকটা দায়সারাভাবে গঠন করা হয় এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি। আর প্রতিটি তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতকরণ, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধের উপায় বা প্রতিকার এবং কিছু সুপারিশ করলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখে না। আবার প্রতিটি কমিটি কোনো সমন্বয় ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ায় নানা বিষয়ে মতানৈক্য থাকে। ফলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত কোনো সুপারিশই বাস্তবায়ন করা হয় না। তাতে নৌপথে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে।
এ বিষয়ে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান জানান, যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে এক লঞ্চের সঙ্গে অন্য লঞ্চের ধাক্কা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, বৈরী আবহাওয়ায় লঞ্চ চালনা, আগুন ও বিস্ফোরণ, মানবসৃষ্ট ভুল, নৌরুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তবে যাত্রীদের অসচেতনতার কারণেও কখনো কখনো নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে।
নৌ-দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী জানান, যে কোনো দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি করা হয়। যারা ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বলে মনে হয় তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয় না। শিপিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রকৌশলী ও বুয়েটের অধ্যাপকসহ সংশ্লিষ্টরাই তদন্ত কমিটিতে থাকেন। আর তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ও সুপারিশের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়। আলোচিত দুর্ঘটনায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিয়েছি। তাদের চাকরিতে পদোন্নতি যেন না হয় সেটাও নিশ্চিত করা হয়। কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নৌপথে দুর্ঘটনা হ্রাসে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। চেষ্টা করা হচ্ছে জনগণের ভোগান্তি যেন কমে।