December 8, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, October 10th, 2021, 8:35 pm

নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী, নেই যথাযথ বাজার তদারকি

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী পেঁয়াজের বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে অন্তত ১০ টাকা। খুচরা বাজারে মান ভেদে এক কেজি দেশি জাত বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও যার দাম ছিল ৫০ টাকার আশপাশে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেলো, এই বাজারে বেড়েছে সবধরনের পেঁয়াজের দামই।
খুচরা বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজ মিলছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন চাহিদার তুলনায় যোগান কমছে। পাশাপাশি আকস্মিক এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ভারতীয় পেঁয়াজের দাম বাড়াকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।
টিসিবির হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে দেশি জাতের দাম বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। বেড়েছে আমদানি করা পেঁয়াজের দামও। যদিও পাইকাররা বলছেন, বিভিন্ন বন্দর দিয়ে আমদানি অব্যাহত আছে। তবে আগের তুলনায় আমদানির হার বেশ কম বলেও স্বীকার করেন তারা। আগে নাসিক ও ইন্দোর জাতের পেঁয়াজ আমদানি হলেও বর্তমানে শুধু ইন্দোর জাত আনা হচ্ছে।
এছাড়া আমদানি কম হওয়ার অজুহাতে বেড়েছে টমেটোর দামও। শীতকালীন সবজি ফুলকপি ও বাধাকপি প্রতি পিসের দাম উঠেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে আকারে খুব ছোটগুলো ১০ থেকে ১৫ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে। পেঁপে ছাড়া অন্যান্য সবজি ৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচের জন্য গুণতে হবে দেড়শ টাকা।
শিমের দাম সেঞ্চুরি পেরিয়ে ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কবে কমেছে আলুর দাম। বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজিতে।
এদিকে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বাজারে বাজারে পেঁয়াজের পাশাপাশি কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে। সরবরাহ কমায় দামের এই ঊর্ধ্বগতি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দুর্গাপূজার কারণে বর্ডারেই পেঁয়াজের দাম বাড়ার কথা জানিয়ে সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
দুর্গাপূজায় ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি এক সপ্তাহ বন্ধ থাকবে, এই অজুহাতে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন রংপুরের ব্যবসায়ীরা। রংপুর সিটি বাজারের পাইকারি মোকামে দেশি পেঁয়াজ ৫৮ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৪৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সেই পেঁয়াজ খুচড়া বাজারে রাখা হচ্ছে যথাক্রমে ৬৫ ও ৫৫ টাকা।
অথচ দেশের অন্যতম বৃহৎ দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৬০০ টন পেঁয়াজ প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আগামী সোমবার থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৬ দিনের জন্য স্থলবন্দর বন্ধ হবে। কিন্তু এই অজুহাতে আগে থেকে পেঁয়াজের দাম বাড়বে কেন- এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর দেশে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। ভারতীয় পেঁয়াজ আসা বন্ধ থাকলেও বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ আছে। তারপরও দাম বাড়ানোর পেছনে অসাধু চক্রের কারসাজি দায়ী বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। এর আগে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে সংকট তৈরি হয়েছিল। টিকার মতো পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বাঞ্ছনীয় নয়।
শুক্রবার রংপুরে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বানিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দুর্গাপূজার কারণে বর্ডারেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। সরবরাহ ঠিক রাখতে বৈঠক করেছেন বলে জানান তিনি।
আরেক দিকে আবার স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে কাঁচা মরিচের বাজার। কেজিতে ২০০ টাকা থেকে ১০০ টাকায় নামার পর দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। এক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে কাঁচা মরিচের দাম।
চাল, ডাল, তেল, মাছ, মুরগি, ডিম, সবজিসহ অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো পেঁয়াজ। শীতকালীন সবজিতে বাজার সয়লাব। গ্রীষ্মকালীন সবজিও এখনো বাজার ছাড়েনি। কিন্তু কোনো সবজি সাধারণের সাধ্যের আওতায় নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষকে শুধু উদরপূর্তি করলেই চলে না। তার স্বাস্থ্যরক্ষায় পুষ্টিকর, সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিটি পণ্যের দাম যদি নাগালের বাইরে থাকে তাহলে কী করে সম্ভব স্বাস্থ্য রক্ষা করা? আর এতে শুধু ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এর প্রভাব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের উপরও পড়বে।
তাঁরা বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী, ক্রেতা যেসব বিষয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন, তা হলো বিক্রেতার পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, সেবার তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা, অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা, পণ্য মজুত করা, ভেজাল পণ্য বিক্রয়, খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্যের মিশ্রণ, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা প্রতারণা, প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ না করা, ওজনে ও পরিমাপে কারচুপি, দৈর্ঘ্য পরিমাপের ক্ষেত্রে গজফিতায় কারচুপি, নকল পণ্য প্রস্তুত, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রয়, অবহেলা।
তাঁরা আরও বলেন, সমস্যা হলো দেশের বেশির ভাগ ক্রেতাই জানেন না প্রতিকার কোথায় ও কীভাবে চাইতে হবে। আর চাইলেই যে প্রতিকার পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আইনানুযায়ী প্রতিটি জেলায় এর অধিদপ্তরের অফিস থাকার কথা। কিন্তু ১৫টি জেলায় কোনো অফিস নেই, পাশের জেলার অফিস দিয়ে কাজ চালানো হয়।‘
বাজারে তদারকি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ ক্রেতারা। ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, বাজার যাদের তদারকি করার কথা তাদের কখনোই বাজারে দেখা যায় না। ফলে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম রাখেন। আবার সুযোগ পেলে মাপেও কম দেন। বাজারে তদারকি থাকলে সরকারি নির্দেশ কিভাবে উপেক্ষিত হয়। তদারকির অভাবে মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়ছে।
দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ নিলেও তা তেমন কার্যকর হচ্ছে না বাজার নিয়ন্ত্রণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সংশ্লিষ্টদের এ দায়িত্ব নিতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা কমিশন করে হলেও পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদের ভাষ্য, বর্তমানে যেভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে এর মূলত কিছু কারণ আছে। বাজারে পণ্যের চাহিদা বেড়েছে তা নয়। এখানে মূলত কারসাজি আছে। এটা সব সময় হয়ে আসছে, কখনো কমে না। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট করে কিছু জরিমানা করা হয়। কিন্তু এতে সাময়িক কিংবা দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফায়দা হয় না। মজুতগত এবং সিন্ডিকেটের ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এখন এর জন্য দরকার বাজার মনিটরিং। এটা করা উচিত সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভার। এর ওপর এখন করোনার সময় ট্রান্সপোর্ট খরচটা বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে আবার চাঁদাবাজিও চলে। এ ছাড়া টাকার প্রবাহ বেড়ে গেলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, মহামারির সময় অনেকের আয়ের উৎস নেই। অনেকের বেতন-ভাতা কমে গেছে। দেখা যাচ্ছে একটা পরিবারে একজন কর্ম করে, তার আয়-রোজগারও কমে গেছে। এ অবস্থায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেশি পড়েছে। এজন্য নিত্যপণ্যের বাজার দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। এটা যেন আরো উপরে উঠে না যায়। সরকার পণ্যের দর নির্ধারণ করে দিলেও কেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ট্রেডবডি বা বিভিন্ন সমিতি আছে। মালিক সমিতি, রিট্রেইলার সমিতি। এরা প্রত্যেকে কিন্তু বিগ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। সরকারও এদের ওপরে বিভিন্ন কারণে ডিপেন্ড করে। সরকারি লোক, সরকারি কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে নানা সুবিধা নিয়ে থাকে। এ কারণে তারা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এখন দরকার হলো মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। এ ক্ষেত্রে সরকারকে খুব শক্ত একটা অবস্থান নিতে হবে। শুধু বাজারে একটু অভিযান, দু’একজন খুচরা ব্যবসায়ীকে জরিমানা- এগুলো করে কোনো লাভ হবে না। মূল সিন্ডিকেটধারীদের শক্ত হাতে ধরতে হবে। প্রয়োজনে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দিতে হবে। এর জন্য তারা আবার প্রতিবাদ করবে। কিন্তু সেটাও শক্ত হাতে দমন করতে হবে। এখানে সরকারের দুর্বলতা আছে। তাদের দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাবেই এরা এসব করতে সাহস পায়।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বা এটা খুবই কঠিন হিসেবে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ। এর জবাবে সাবেক এই গভর্নর বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতি থিওরি মানেতো সব অবাধে চলবে তা নয়। এটাকে অবশ্যই কন্ট্রোলের মধ্যে রাখতে হবে। কোল্ড স্টোরে যদি একটা পণ্য ২৩ টাকা হয় আপনি সেটা বাইরে গিয়ে ৫০ টাকায় কেন বিক্রি করবেন। এগুলোকে নজরদারি করতে হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতি বলে একেবারে ছেড়ে দেবেন তা উচিত না। আরেকটা বিষয় হলো বাংলাদেশে যদি টিসিবি ভালো থাকতো বা অন্য সরকারি সংস্থাগুলো যদি ভালোভাবে কাজ করতো তাহলে এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন কিছু নয়। টিসিবিতো নামে মাত্র।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিুজল ইসলামের ভাষ্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। এ ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট থাকে এটা ঠিক। কিন্তু সরবরাহ না বাড়ালে শুধু দর নির্ধারণ করে দিয়ে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এই মুহূর্তে পণ্যের দাম কমাতে হলে অবশ্যই সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।
বাজারের এমন অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের। বাজারে অভিযানও চালানো হয়। ব্যবসায়ীদের জরিমানাও করা হয়। কিন্তু কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ তথা ক্যাব-এর ভাষ্য, সব রোগের চিকিৎসায় যেমন একই ওষুধ নয়, তেমনি সব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ একই ব্যবস্থায় হতে পারে না। মূল কথা হলো- সরবরাহ বাড়াতে হবে। তাহলেই দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে, স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু যারা মজুত ধরে রেখেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের ধরে শাস্তি দেয়া হোক, জেলে দেয়া হোক, তাহলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।