May 26, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, February 20th, 2022, 8:21 pm

পাটবীজ আমদানিতে হ-য-ব-র-ল অবস্থা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের পাটের উৎপাদন ভারতীয় বীজের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ভারত থেকে পাটবীজ আমদানিতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে। কারণ প্রকৃত পাটবীজ আমদানিকারকদের পাশাপাশি সিজনাল অপেশাদার অনেক লাইসেন্সধারীও আইপি পাচ্ছে। ফলে আইপি বরাদ্দের নামে নামমাত্র লাইসেন্সধারী ব্যক্তিরাও পাট মওসুমে কিছু কামিয়ে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের সাথে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের কিছু কর্মকর্তারও যোগসাজশ রয়েছে। আর শুধু সিজনাল ব্যবসায়ীই নয়, চাহিদা অনুযায়ী আইপি না পেয়ে অনেক বড় ব্যবসায়ী মধ্যেও সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। চাহিদামাফিক পাট বীজ আমদানি করতে তারা নামে-বেনামে লাইসেন্স তৈরি করে ভারত থেকে পাটবীজ আমদানি করছে। সব মিলিয়ে পাটবীজ আমদানিতে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে পাট চাষে যে পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হয় তার বেশির ভাগই ভারত থেকে আমদানি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকার পাটবীজে ভারতনির্ভরতা কমাতে ৫ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ নিয়েছে। চলতি অর্থবছর থেকে তা শুরু হয়ে ২০২৬ সাল নাগাদ স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসবে আশা করা হচ্ছে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) বিজ্ঞানীরা জিনোম গবেষণায় পাটজাত রবি-১ (তোষা পাট-৮) উদ্ভাবন করলেও তা ভারতীয় জেআরও-৫২৪ জাতের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে দেশীয় ওই উচ্চফলনশীল জাতটি ভারতীয় জাতের কাছে মার খাচ্ছে। বিজেআরআই উদ্ভাবিত তোষা পাট-৮ জাতটির জীবনকাল তুলনামূলকভাবে ভারতীয় জাতের চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু ফলন একটু কম হলেও কৃষকরা স্বল্প জীবনকালের ভারতীয় জেআরও-৫২৪ জাতটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাছাড়া ভারতীয় পাটের আঁশ অপেক্ষাকৃত একটু ভালো হওয়ায় বাজারে চাহিদাও বেশি। মূলত কৃষকদের মধ্যে বিজেআরআইয়ের তোষা পাট-৮ আশানরূপ জনপ্রিয় করা যায়। সেজন্যই ভারতীয় জাতের কাছে মার খাচ্ছে দেশীয় জাতের পাট।
সূত্র জানায়, বছরে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ মেট্রিক টনের মতো পাটবীজের প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে বিএডিসি সরবরাহ করে প্রায় ৭০০ টন বীজ। বাকি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টন বীজই ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় ৬-৭ লাখ হেক্টর জমিতে ৭০-৭৫ লাখ বেল (১ বেল সমান ০.২২ মে. টন) পাট উৎপাদন হয়। তার মধ্যে বেশির ভাগই তোষা জাতের পাট। ওই জাতের পাট আবাদের ৮৫-৯০ ভাগ বীজই (জেআরও-৫২৪) ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। এদেশে ভারতীয় কয়েকটি কোম্পানির ব্র্যান্ড বেশ পরিচিত। ওসব কোম্পানি বাংলাদেশে আইপি অনুমোদন এবং এলসি খোলার অপেক্ষায় থাকে। নিশ্চিত হওয়ার তারা ইচ্ছে মতো দাম বাড়িয়ে দেয়। আর তার প্রভাব পড়ে এদেশে। ভারতীয় রফতানিকারকরা বীজ রেডি করে রাখে। তারা শুধু আইপির জন্য অপেক্ষায় থাকে। পাটবীজ ব্যবসায়ীরা চাচ্ছে যারা প্রকৃত আমদানিকারক তাদের চাহিদা অনুযায়ী যেন আইপি দেয়া হয়।
সূত্র আরো জানায়, মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পাটবীজ বপনের ভরা মওসুম। জাতীয় বীজ বোর্ডের (এনএসবি) সভায় পাটবীজ আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়ে থাকে। চলতি মাসেই ওই সভা হওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং থেকে বীজ আমদানির জন্য সার্কুলার দেয়া হয়েছে। দেশে প্রায় শত কোটি টাকার পাটবীজের ব্যবসা রয়েছে। বীজ আমদানির জন্য গত বছর দুই হাজারেরও বেশি ব্যবসায়ী আইপির জন্য আবেদন করে। আর যাচাই-বাছাই করে অধিকাংশ লাইসেন্সই আইপি পায়। কিন্তু আইপি দেয়ার সময় হলেই মওসুমি ব্যবসায়ীদের তৎপরতা শুরু হয়। ভারতীয় পাটবীজ আমদানিতে দু’টি পোর্টের (বুড়িমারী ও বেনাপোল) অনুমতি রয়েছে। তার মধ্যে বেনাপোল খুবই ব্যস্ত বন্দর। সেখানে দীর্ঘলাইনে ট্রাক অপেক্ষা করে খালাস পেতে কখনো কখনো পাট মওসুমই চলে যায়। ফলে আমদানিকাররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর আরেক স্থলবন্দর বুড়িমারী দিয়ে পরিবহন ভাড়া কয়েকগুণ বেশি। কারণ ভারত থেকে এবং ঢাকা থেকে ওই স্থলবন্দরের দূরত্ব অনেক বেশি। ফলে আমদানি খরচ বেড়ে যায়।
এদিকে পাটবীজ আমদানির ক্ষেত্রে নানা জটিলতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) পাটবীজ উপ-কমিটির আহ্বায়ক বেনিয়াত হোসেন জানান, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ব্যবসায়ীরা পাটবীজ আমদানির জন্য চাচ্ছে। কারণ সেটা এখন পরিপূর্ণ বন্দরে রূপ নিয়েছে। পরিবহন খরচও কম পড়বে। এদেশে পাট মূলত রংপুর অঞ্চল, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, ঝিনাইদহ, যশোর, ময়মনসিংহে চাষ হয়। যেহেতু ওই অঞ্চলে পাট চাষ বেশি হয় তাই হিলি থেকে দেশের ভেতরে দূরত্ব কম। তাতে পরিবহন খরচ কম হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মহাব্যবস্থাপক (পাট বীজ) মো: ইব্রাহিম হোসেন জানান, পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া কঠিন। কারণ দেশ ভারতীয় পাটবীজের ওপর নির্ভরশীল। ভারতীয় জাতটির জীবনকাল কম এবং ফলন বেশি। বিজেআরআই ভালো জাত উদ্ভাবন করেছে কিন্তু সেটি এখনো চাষিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি। বিএডিসি আগে ৬০০-৭০০ টন সরবরাহ করতো। আশা করা যায় এবার বিজেআরআইয়ের নতুন জাতটিসহ ১৩০০ টন সরবরাহ করা সম্ভব হবে।