September 30, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, January 18th, 2022, 7:00 pm

বাগেরহাটে মিলল সাড়ে ছয়শ’ বছর আগের তৈজসপত্র!

বাগেরহাটে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত স্থাপনা বিখ্যাত মুসলিম শাসক খানজাহান আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির বসতভিটায় মিলেছে ছয়শ’ বছর আগের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে এই স্থাপনায় আবার খনন শুরু করেছে প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর। খননের পর মাটির নিচ থেকে এবার বেরিয়ে এসেছে সুলতান ও মোগল আমলের বিভিন্ন তৈজপত্র।

এর আগে মাটির নিচ থেকে পঞ্চদশ শতকে নির্মিত খানজাহানের বাসভবনের বিভিন্ন কক্ষের ভিত্তি, প্রাচীর, গোলাকার কর্নার, বুরুজ (গুম্বজ), প্রাচীন রাস্তা, মুসলিম ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ পেইন্টিং ওয়্যার, স্টোন, ওয়্যার, পোরসোলাইন পাত্রের টুকরা ও পানি নিষ্কাশনের ড্রেনের সন্ধান পাওয়া গেছে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জানায়, ২০০১ সাল থেকে প্রায় ১০ একর আয়তনের ওই বসতভিটা খনন করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই অর্থবছরে পুনরায় খনন কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত খনন কাজ চলবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানায়, ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো খানজাহান আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদসহ ১৭টি স্থাপনা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে। এর মধ্যে খানজাহান আলীর বসতভিটা অন্যতম। বাগেরহাট সদরের সুন্দরঘোনা গ্রামে খানজাহানের বসতভিটা খননের জন্য ১৯৯৭ সালে ৯ একর ৬৭ শতক জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে খনন কাজ চলছে।

সরেজমিনে সুন্দরঘোনা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, খানজাহান আলীর বসতভিটায় ৬ মিটার বাই ৬ মিটার গ্রিক করে হেরিচমেট্রিক্স পদ্ধতিতে খনন কাজ চলছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাত জনের বিশেষজ্ঞ টিম খনন কাজ করছেন। তার সঙ্গে স্থানীয় ১৪ জন নারী-পুরুষ খনন কাজে যুক্ত হয়েছেন। মাটি খনন করে প্রায় দুই থেকে তিন মিটার গভীরে বিভিন্ন স্থাপত্য মিলছে। কাছে চার পাশ দিয়ে ঘিরে সেখানে রাখা হচ্ছে মাটির নিচে পাওয়া বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠোমোর ধ্বংসবাশেষ ও মৃৎ শিল্পের বিভিন্ন ভগ্নাংশ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতার নেতৃত্বে এই খনন কাজ চলছে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আশা করছে যে খনন কাজ সম্পূর্ণ হলে খানজাহান আলী (রহ.) এর বাসভবন সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে। মাটির নিচে প্রাপ্ত স্থাপত্য গবেষণার মধ্যে দিয়ে পঞ্চদশ শতকের তথ্য সমৃদ্ধ হবে এবং প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাসে নব অধ্যায়ের সূচনা হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, ‘খাজাহান আলীর বসভিটায় খনন কাজের অন্যতম লক্ষ্যে হচ্ছে, মধ্যযুগের (১২০১-১৮০০ খ্রি) অন্যতম ঐতিহাসিক শহর খলিফাতাবাদের (বর্তমান বাগেরহাট) সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও প্রাচীন মানুষের বসত সম্পর্কে জানা এবং তুলে ধরা। ২০০১ সাল থেকে খনন কাজ চলছে। এরই মধ্যে খানহাজান আলীর সমসাময়িক সময়ে প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগের বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ, মেঝে, ইটের দেওয়াল, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মাটির পাত্র, প্রদীপদানি, সংরক্ষণআধার অলংকৃত ইটসহ বিভিন্ন স্থাপত্য পাওয়া গেছে। এছাড়া সুলতানি ও মোগল আমলের বেশকিছু প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে।’

তিনি বলেন, ‘ধারাবাহিকভাবে খননের মাধ্যমে প্রাপ্ত স্থাপত্য অংশসমূহকে সংরক্ষণ করে যাদুঘরে রাখা হবে এবং উন্মুক্ত প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মন্তরে জাতির সামনে তুলে ধরতে চাই। একই সঙ্গে সমগ্র বিশ্বের কাছে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরা হবে।

খানজাহান আলীর বসতবাড়ি প্রসঙ্গে আফরোজা খান মিতা বলেন, ‘খানজাহান (রহ.) এর এটা বসতবাড়ি তা নিশ্চিত করে বলার মতো ঐতিহাসিক কোন তথ্যপত্র নেই। তবে এটা খানজাহান আলীর বসবাড়ি হতেও পারে। তবে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এটা তার বাড়ি।

সঠিক ইতিহাস জানতে হলে আরও অনেক দিন ধরে খনন কাজ করতে হবে বলে তিনি জানান।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বাগেরহাটের কাস্টোডিয়ান মোহাম্মদ জায়েদ জানান, খানজাহান আলীর বসতভিটা খনন করে যে সব স্থাপত্য পাওয়া যাচ্ছে তা রেজিস্ট্রেশন করে প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব যাদুঘর অথবা সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণ করা হবে। আর খনন করা ওই ডিবিগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হবে। একই সঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে।

খনন কাজ দেখতে আসা খানজাহান (রহঃ) মাজার এলাকার কলেজছাত্র জুম্মান শেখ জানান, তিনি জেলার সব পুরাকৃর্তি নিয়ে কাজ করে একটি তালিকা প্রস্তত করেছেন। এই খননের মাধ্যমে বাগেরহাটের ইতিহাস ও ঐহিত্য পূণর্গঠিত হবে বলে তিনি আশাবাদী।

স্থানীয়রা জানান, খানজাহান আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির বসতবাড়ি শুধু খনন করে রেখে দিলেই হবে না। এটাকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং ষাটগম্বুজ মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এই বসতবাড়িটিকে একটি ব্লকের মধ্যে আনা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় স্থানে পরিণত হবে।

হযরত পীর খানজাহান আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির দক্ষিণবঙ্গের এক অবিস্মরণীয় নাম। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারক এবং আবাদকারী হিসেবে তিনি সারা দেশের মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত। প্রবাদ আছে হয়রত পীর খানজাহান (রহ.) পারস্য দেশীয় একজন ধনবান মুসলমান ছিলেন। ৬০ হাজার সৈন্য ও ১১ জন আউলিয়া নিয়ে তিনি এই দেশে আগমন করেন। আর আজকের এই বাগেরহাটে তার আগমন ঘটে ১৪২৯ খ্রিস্টাব্দে, মাজারে পাথরে ক্ষুদাই করে তার মৃত্যুর তারিখ লেখা রয়েছে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ, তবে তাকে ঘিরে অস্পষ্টতার শেষ নেই।

খানজাহান (রহ.) এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্ত্তি বাগেরহাট ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ষাটগম্বুজ মসজিদ নাম হলেও এখানে রয়েছে ৭৭টি গুম্বজ। ২১ ফুট উচ্চতা এই গুম্বজগুলো বাংলা চৌচালারীতিতে নির্মিত। ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ পাশে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। খানজাহান (রহ.) ষাটগম্বুজ মসজিদ সংলগ্ন আরও কিছু কৃর্তির মধ্যে রয়েছে- খাঞ্জেলি দীঘি, মাজার শরিফ, মোহাম্মদ তাহেরের মাজার, জিন্দাপীরের মাজার, একগম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনীর মসজিদ, পচা দীঘি, চুনখোলা মসজিদ ও সিংরা মসজিদ।

—ইউএনবি