May 20, 2024

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, February 27th, 2023, 9:59 pm

বাড়ছে না দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের উৎপাদন

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন গ্যাসক্ষেত্রে অর্ধেকেরও বেশি গ্যাস মজুদ আছে। কিন্তু ওই কোম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত সেভাবে সরবরাহ বাড়াতে পারেনি। দেশে গ্যাসের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এখনই স্থানীয় সরবরাহের বিকল্প চ্যানেল বা সরবরাহ লাইন তৈরি করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে গ্যাস খাত। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন (২২০ কোটি) ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। তার মধ্যে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন (১৩০ কোটি) ঘনফুটের কিছু বেশি সরবরাহ হচ্ছে। যা মোট স্থানীয় সরবরাহের ৬০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন পরিচালিত ৩টি গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ ৪৭৬ বিলিয়ন (৪৭ হাজার ৬০০ কোটি) ঘনফুটে নেমে এলেও দেশীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদন বাড়ছে না। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানের মতো গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই শেভরনের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ ফুরিয়ে আসার কথা। তখন জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতি পূরণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ তা না হলে মহাসংকটে পড়তে পারে দেশের গ্যাস খাত। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশী কোম্পানিগুলোর পক্ষে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ দেশীয় কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর ধরে উত্তোলন বাড়াতে পারেনি। বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ নিয়েও গ্রিডে কম সরবরাহ করছে। আর এখন যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তাতে দেশীয় কোম্পানি থেকে বড় ধরনের কোনো গ্যাস সরবরাহ গ্রিডে আসবে না। যদিও স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন কোম্পানিগুলোর দাবি, শেভরনের মজুদ ফুরাতে ফুরাতেই দেশীয় কোম্পানিগুলোর পরিচালনাধীন ক্ষেত্র থেকে নতুন গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হবে। তার সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুন নতুন কূপ খননের মাধ্যমে উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি সহজ মনে করছেন না জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি কূপ খনন থেকে শুরু করে গ্যাস পাওয়া গেলে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে কমপক্ষে দুই বছর সময় প্রয়োজন। তবে কূপ এলাকা আগেই চিহ্নিত হলে ও ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা না থাকলে ওই সময় কিছুটা কমে যেতে পারে। সূত্র জানায়, নতুন একটি কূপ খনন করার পরিকল্পনা নেয়া হলে শুরুতেই কূপ খনন এলাকা চিহ্নিতকরণের (লোকেটিং দ্য ড্রিলিং পয়েন্ট) কাজ করতে হয়। তারপর সেখানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ, সিসমিক সার্ভে ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। আর তা করতে এক-দুই বছর সময় লেগে যায়। তারপর কূপ খননের জন্য বিশদ প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করতে হয়। বাপেক্স থেকে এ ধরনের ডিপিপি তৈরি করে তা পেট্রোবাংলার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সেখান থেকে সেটি জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়। এরপর অনুমোদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন বা গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের (জিডিএফ) অর্থায়নে কূপ খনন শুরু করা হয়। সেটি করতেও কখনো কখনো এক-দেড় বছর সময় লেগে যায়। তবে বাপেক্স ছাড়া অন্য কোম্পানি দিয়ে এ ধরনের কাজ করালে কোম্পানি নির্বাচন, দরপত্র আহ্বান, প্রকল্পের মালামাল ক্রয় বা ভাড়াসংক্রান্ত কাজে আরো দেড়-দুই মাস সময় লেগে যায়। পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় যাতায়াত ও পরিবহনের সুবিধার্থে সড়ক নির্মাণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও লোকবল নিয়োগের মতো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেও কিছু সময়ের প্রয়োজন পড়ে। প্রকল্প এলাকায় রিগ স্থাপন থেকে শুরু করে গ্যাস পাওয়া পর্যন্ত ১০০-১২০ দিনের মতো প্রয়োজন পড়ে। সব মিলিয়ে গোটা প্রক্রিয়ায় ৩/৪ বছর সময় লেগে যায়। যদিও গ্যাস কূপ খননে জমি অধিগ্রহণ ও জরিপসহ আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি অনুসন্ধান কূপ খননে বাপেক্সের তিন-চার মাস সময় লাগে। আবার কূপ খননের প্রকল্প গ্রহণ, অর্থায়ন ও প্রকল্প এলাকায় যেতে কখনো দুই-তিন বছর লেগে যাওয়ারও নজির রয়েছে। ফলে গ্রিডে সরবরাহ কমলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাচ্ছে। বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সূত্র আরো জানায়, দেশে ২৬টি গ্যাসফিল্ডের আওতায় মোট ১০ হাজার ৭৬ বিলিয়ন (১০ লাখ ৭ হাজার ৬০০ কোটি) ঘনফুট মজুদ রয়েছে। তার মধ্যে সিলেট গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিএফসিএল) সবচেয়ে বেশি মজুদ রয়েছে। সংস্থাটির ৫টি গ্যাসফিল্ডে মজুদ রয়েছে ৫ হাজার ১৯৭ বিলিয়ন (৫ লাখ ১৯ হাজার ৭০০ কোটি) ঘনফুট গ্যাস। তাছাড়া বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের ১ হাজার ১২৬ বিলিয়ন ঘনফুট, বাপেক্সের ২ হাজার ৪২০ বিলিয়ন (শাহবাজপুর ও ভোলা নর্থসহ), শেভরনের ৪৭৬ বিলিয়ন ও তাল্লোর ৮৪ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে। তবে কম মজুদ নিয়েও উত্তোলনের শীর্ষে রয়েছে শেভরন। কোম্পানিটি দৈনিক ১৩২ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করছে। আর সবচেয়ে বেশি গ্যাস মজুদ নিয়ে কম গ্যাস উত্তোলন করছে এসজিএফসিএল। সংস্থাটির দৈনিক উৎপাদন ৯ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটের মতো। স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন কোম্পানিগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে কম উত্তোলন করছে এসজিএফসিএল। চলতি বছর রশিদপুর, কৈলাসটিলা ও হরিপুর গ্যাসফিল্ডে কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রশিদপুরে দুটি কূপ খনন এবং কৈলাসটিলা ও হরিপুরে দুটি কূপের ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে এসজিএফসিএলের ফিল্ড থেকে আরো ৫-৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া দেশের গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন কাজ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্স। সংস্থাটির আওতায় থাকা গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক সরবরাহ আসছে ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। যদিও সংস্থাটির মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি ঘনফুটের মতো। ইতোমধ্যে সংস্থাটি আগামীতে গ্যাসের উত্তোলন ও মজুদ বাড়াতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে সংস্থাটি তাদের নিজস্ব গ্যাসফিল্ডে মোট ১৯টি কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে অনুসন্ধান ৯টি এবং উন্নয়ন কূপ ১০টি। এর মাধ্যমে নতুন করে আরো ১৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এদিকে দশে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে ৪৬টি কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জ্বালানি বিভাগ। এর মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরকারের সাড়ে ৬১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজার থেকে এলএনজি আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও অর্থ ও ডলার সংকটে এলএনজি আমদানি কার্যক্রম ও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়াতে সিলেট গ্যাসফিল্ডের আগামীর পরিকল্পনার বিষয়ে সিলেট গ্যাসফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান জানান, আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে এসজিএফসিএল থেকে দৈনিক ১৬৪ মিলিয়ন (১৬ কোটি ৪০ লাখ) ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সেজন্য ৭টি কূপের ড্রিলিং ও ৭টি কূপের ওয়ার্কওভার করা হবে। কূপ খননে বাপেক্সের পাশাপাশি চীনের সিনোপ্যাক কাজ করবে। এরই মধ্যে সিনোপ্যাক থেকে রিগ ভাড়ার চুক্তিও হয়ে গেছে। একই প্রসঙ্গে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী জানান, কূপ খননে রিগের শিডিউল করা হয়েছে। আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাপেক্স ওই শিডিউল অনুযায়ী কাজ করবে। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও কূপের ওয়ার্কওভার কাজ চলছে। পাশাপাশি আরো বৃহৎ আকারে গ্যাস অনুসন্ধানে এরই মধ্যে স্থলভাগের ব্লক ১৫ ও ২২-এ তিন হাজার লাইন কিলোমিটার টুডি সিসমিক সার্ভে শেষ হয়েছে।