May 26, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, February 27th, 2022, 8:41 pm

বিপুল বিনিয়োগেও সড়ক-মহাসড়কে কাটছে না অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকার এক দশকে সড়ক পরিবহন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। চার-ছয় লেনের নতুন সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু, ফ্লাইওভারসহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়েছে বিপুল টাকা। পাশাপাশি নগর-মহানগরের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু এতো বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগেও সড়কে নিরাপত্তা বা স্বস্তি নিশ্চিত হয়নি। বরং দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বেড়েছে যানজটও। ফলে একদিকে বিলম্বিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ পরিবহন খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় প্রতিনিয়ত নাজেহাল হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি বিভাগের ৬টি সংস্থা, অধিদপ্তর ও করপোরেশনের মাধ্যমে ২০১১-১২ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিনিয়োগ হওয়া অনেক অবকাঠামো চালু হয়েছে। আর এখনো চলমান বা শেষের পথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নির্মাণ কাজ। কিন্তু ওই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগও দেশের সড়ক চলাচলকে নিরাপদ করে তুলতে পারেনি। বরং এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে সড়কে দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণ। বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যানুযায়ী ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২০১২ সালে ওই সংখ্যা ছিল আড়াই হাজার।
সূত্র জানায়, ৪-৬ লেনের সড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো বৃহৎ অবকাঠামোগুলোও সড়ক যাতায়াতে মানুষের ভোগান্তি কমাতে পারেনি। বরং বিলম্বিত করছে পণ্য পরিবহন। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত যাতায়াতের সময় কমলেও এখনো যাত্রাবাড়ী থেকে ঢাকার বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রী দুর্ভোগ আগের মতোই রয়েছে। এক দশক আগে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে যাতায়াতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগতো। এখন চার লেনের সড়ক হওয়ার পরও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বরং গাড়ির চাপ বাড়লে এখনো মহাসড়কটি পাড়ি দিতে ৬-৭ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কেরও একই অবস্থা চার লেন হওয়া। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা কোনো সড়কেই স্বস্তিতে চলতে পারছে না মানুষ। পাশাপাশি টেকসই হচ্ছে না বিপুল ব্যয়ে নির্মিত সড়কগুলো। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ডিজাইন ম্যানুয়াল অনুযায়ী নির্মাণের পর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের মধ্য দিয়ে একটি সড়ক ২০ বছর পর্যন্ত টেকসই হওয়ার কথা। কিন্তু নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও উপকরণ ব্যবহার, নকশা ও পরিকল্পনার ত্রুটি-বিচ্যুতি, ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন কারণে এক-দেড় বছরের মাথায়ই নষ্ট হচ্ছে সড়ক। চলাচলের জন্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উঠছে। আর ভাঙাচোরা সড়কে যাতায়াতে যেমন বাড়তি সময় লাগছে, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। আবার সড়কের পাশে গড়ে ওঠা হাটবাজারও দুর্ঘটনা-যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সওজ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী এখনো দেশের ৩ হাজার ৬৪৭ কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা দশায় রয়েছে। আর যেসব সড়ক ভালো আছে সেগুলোর বিভিন্ন নকশা ও পরিকল্পনাগত ত্রুটি-বিচ্যুতি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশের পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও বাস্তবে তা নিয়ন্ত্রণ করছেন গুটিকয়েক পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতা। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রভাবেই দেশের সড়কে-মহাসড়কে আনফিট গাড়ি অবাধে চলছে। বিআরটিএর হিসাবে বর্তমানে দেশে আনফিট গাড়ির সংখ্যা ৫ লাখেরও বেশি। তাছাড়া অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যাও কয়েক লাখ। সরকার সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর সড়ক আইন (সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮) করা হলেও মালিক-শ্রমিকদের চাপে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল কারো সুপারিশই ঠিকঠাক বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দিন দিন আরো অনিরাপদ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের সড়ক।
এদিকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার জানান, আগামী ২০৩০ সালে দুর্ঘটনার সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যের একটি ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্র্যাটেজিক অ্যাকশন প্ল্যান করা হচ্ছে। তার মাধ্যমে ধাপে ধাপে দুর্ঘটনার পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে। ওই কৌশলগত পরিকল্পনা তখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, যখন সড়কের সব ধরনের ব্যবহারকারী আরো দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকা রাখতে শুরু করবে। একইভাবে সড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় বিআরটিএসহ দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মনির হোসেন পাঠান জানান, সড়ক নিরাপত্তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সংস্থার বিষয় নয়। এর সঙ্গে অনেকগুলো সংস্থা জড়িত। কোনো সংস্থা সড়ক নির্মাণ করে, কোনো সংস্থা সড়কের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে, আবার কোনো সংস্থা সড়ক ব্যবহারকারীদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকে। সবক’টি সংস্থা যদি তাদের দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করে তাহলে অবশ্যই সড়ক অবকাঠামোকে নিরাপদ করে গড়ে তোলা সম্ভব। সওজ অধিদপ্তর নিজের দায়িত্বটুকু যথাযথভাবেই পালন করছে।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম জানান, ২০০৮ সালের দিকে বাংলাদেশে যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৮-১০ লাখ। বর্তমানে তা প্রায় ৪৮ লাখে উন্নীত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ সময়ে দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন করা হয়েছে। দেশে গত এক যুগে চার-পাঁচ গুণ যানবাহন বেড়েছে। ওই তুলনায় সড়ক দুর্ঘটনা বাড়েনি; বরং কমেছে এবং সড়ক দুর্ঘটনার হার আরো কমিয়ে আনতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যেসব সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে, সেগুলোয় অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি স্বস্তিতে যাতায়াত করছে। গত এক দশকে বিনিয়োগ করা এমন প্রতিটি সড়ক অবকাঠামো থেকেই সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ।