October 6, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, September 12th, 2022, 9:53 pm

বেপরোয়া তিতাসের দুর্নীতিবাজরা

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তিতাস গ্যাস কোম্পানির দুর্নীতিবাজরা। মূলত দীর্ঘদিনেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখনো কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। ফলে সেবার মান না বেড়ে বরং বৈধ গ্রাহকদের হয়রানি বাড়ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে তিতাসের ২২টি খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে ১২ দফা সুপারিশ করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। তিতাসের দুর্নীতিবাজ চক্র লাইসেন্সবিহীন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিটির অধীনে অসংখ্য অবৈধ সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে। অবৈধ ওই বাণিজ্য বন্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে ৮ দফায় চিঠি দেয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং বিইআরসির আদেশ ছাড়াই প্রি-পেইড মিটারের মাসিক ভাড়া ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। কম মূল্যের প্রিপেইড মিটারেরও বেশি মূল্য নেয়া হচ্ছে। তিতাস সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গ্যাস বিতরণে কোম্পানিটিতে অভিনব ও কল্পনাতীতভাবে দুর্নীতি চলছে। দেশে যখন বৈধ সংযোগ বন্ধ তখন সংযোগ দেয়া হয়েছে। আবার সেসব গ্রাহকের আস্থা সৃষ্টি করতে ভুয়া কাগজপত্রও তুলে দেয়া হয়। ভুয়া ওই গ্রাহকরা যথারীতি পে-স্লিপের মাধ্যমে ব্যাংকে ১০০ কোটি টাকা জমা করেছে। তিতাসের আবাসিক গ্রাহকেরা যেসব ব্যাংকে প্রতি মাসে গ্যাসের বিল জমা দেয় ওই ব্যাংকগুলো থেকেই ওই বাড়তি টাকার হিসাব কোম্পানির কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগে আসে। কিন্তু ওই টাকা তিতাসের হিসাবে জমা দিতে না পেরে পোস্টিং না হওয়ায় বেকায়দায় পড়ে তিতাস। তাছাড়া গভীর রাতে সার্ভারে ঢুকে অবৈধ গ্রাহককে বৈধ করা হয়। ইতোমধ্যে রাতের আঁধারে কোম্পানির সার্ভারে এন্ট্রি দিয়ে বৈধ করার দায়ে ধরা পড়ে ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী। আবার গ্রাহকরা বিল জমা দিয়েছে কিন্তু লেজারে তা জমা হয়নি এমন ঘটনা ঘটেছে । কিছু অসাধু কর্মকর্তা গ্রাহকদের ওসব টাকা মেরে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, খোলা বাজারে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে প্রি-পেইড মিটার পাওয়া গেলেও তিতাস প্রতিটি মিটার ২৩ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছে। ফলে কয়েক লাখ মিটার কিনতে তিতাস গ্রাহকদের বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ওই কোম্পানিটির দুর্নীতির বিষয়ে দুদকও সার্বিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। দুদকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিতাসের দুর্নীতির ২২টি খাত চিহ্নিত করে তার মধ্যে ১২ দফা সুপারিশ প্রদান করে। কিন্তু তাতেও থেমে নেই দুর্নীতি। বরং রহস্যজনক কারণে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হচ্ছে না।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন থেকে তিতাসকে কয়েক বছর ধরে দফায় দফায় চিঠি দেয়া হলেও তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ওই চিঠির ব্যাপারে তিতাস গ্যাস কোনো উদ্যোগ নেয়নি। আর ওই সুযোগে বেআইনিভাবে শতাধিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্যাসের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানিটির অধীনে ৩৯৬টি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে। রেগুলেটরি কমিশনের আইন ২০০৩ এর ধারা ২৭(১) অনুযায়ী সিএনজি মজুদকরণ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিইআরসি হতে লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক। তাছাড়া গ্যাস আইন ২০১০-এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী কমিশনের নিকট থেকে লাইসেন্স গ্রহণপূর্বক সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবসা শুরু করতে পারবে মর্মে নির্দেশনা রয়েছে। ফলে অনেক সিএনজি ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যবসায়ী লাইসেন্স গ্রহণ করেনি। যা বিইআরসি ও গ্যাস আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যা একই আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চিঠির সঙ্গে ঢাকার ৪০টি, নারায়ণগঞ্জের ১৫টি, নরসিংদীর ১০টি, গাজীপুরের ১০টি, মুন্সীগঞ্জের ২টিসহ তিতাসের মোট ৭৯টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাস সংযোগ বন্ধে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বরং তিতাসের বিরুদ্ধে আগে সংযোগে ঢালাওভাবে লোড বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন সংযোগ প্রদান করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকার দুদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। ক্যাপটিভে ১ মিলিয়ন গ্যাস দিয়ে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কিন্তু একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
এদিকে তিতাসের দুর্নীতি প্রসঙ্গে বিইআরসির সদস্য মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী জানান, বিইআরসি আইন-২০০৩ ও গ্যাস আইন-২০১০ অনুযায়ী বিইআরসির লাইসেন্স ছাড়া সিএনজি স্টেশন পরিচালনা করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ শতাধিক ফিলিং স্টেশন লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ওসব সিএনজি রি-ফুয়েলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০১৪ সালে প্রথম চিঠি দেয়া হলেও এখনো তাতে তিতাসের সাড়া মিলছে না।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশীদ মোল্লা জানান, তিতাসের পক্ষ থেকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে চিঠি দেয়া হয়েছে। তাদের ১০ দিনের সময় দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে লাইসেন্স না নিলে লাইন কেটে দেয়া শুরু হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ৮ দফা চিঠি দেয়া হয়েছে। আর বিইআরসি তো লাইন কাটতে পারে।