December 2, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, November 3rd, 2022, 9:35 pm

ব্যয় ছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধিতে থেমে থাকে না আনুষঙ্গিক খরচ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ বাড়ালে থেমে থাকে না নানা আনুষঙ্গিক খরচ। ফলে মেয়াদ বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের পেছনে সরকারের খরচ বাড়তেই থাকে। কারণ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ প্রায় ২২ ধরনের ভাতা বহাল থাকে। তার সঙ্গে মেরামত, সংস্কার, গাড়ি ভাড়া, জ্বালানি ও অফিস ভাড়াসহ নানা খরচ হতেই থাকে। অথচ প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ বৃদ্ধি বলা হয়। বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে ওরকম ৩২১টি প্রকল্প ব্যয় ছাড়াই মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ৬ মাস থেকে শুরু করে ৩ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যয় না বাড়িয়ে গত অর্থবছরে ৩২১টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক বিভাগের সবচেয়ে বেশি ৯১টি প্রকল্প ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্থানীয় সরকার বিভাগের ছিল ৫১টি প্রকল্প। তৃতীয় স্থানে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের ৩০টি। তাছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আছে ২১টি করে প্রকল্প। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৫টি, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের ১১টি, শিক্ষা ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ৬টি করে এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আছে ৫টি প্রকল্প। তাছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের ৭টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ৫টি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ৪টি এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ৪টি প্রকল্প। আর বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ৩টি প্রকল্প। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ৪টি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ৩টি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩টি এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ৩টি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ৩টি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৩টি এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৩ট প্রকল্প। তাছাড়া সুরক্ষা ও সেবা বিভাগ, সাংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২টি করে প্রকল্প রয়েছে। তাছাড়া ৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একটি করে প্রকল্প রয়েছে।
সূত্র জানায়, সরকার থেকে টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো সহজ উপায়। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ত থাকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থব্যয় করতে হয়। সাধারণত একটি প্রকল্পে রাজস্ব ব্যয়ের মধ্যে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের বাইরেও থাকে প্রায় ২২ ধরনের ভাতা। সেগুলো হলো বাড়ি ভাড়া ভাতা, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, টিফিন ভাতা, যাতায়াত ভাতা, শিক্ষা ভাতা, মোবাইল/সেলফোন ভাতা, অন্যান্য ভাতা এবং ভ্রমণ ভাতা। আরো থাকে আবাসিক টেলিফোন ভাতা, অধিকাল ভাতা, সম্মানি ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতা, কোয়ালিফিকেশন পে, নিযুক্তি বেতন, উচ্চায়ন বেতন, এসএসজি পে, বিবাহ পে, পোশাক ভাতা, ক্ষতিপূরণ ভাতা, ব্যাটম্যান ভাতাসহ নানা ভাতা। সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক বিভিন্ন খরচের মধ্যে থাকে অফিস ভাড়া, টেলিফোন বিল, গাড়ি পরিচালনা, ড্রাইভারের বেতন, গ্যাস ও জ¦ালানি বিল, বিদ্যুৎ বিল, পেট্রোল-ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট বিল এবং অফিস ব্যয়সহ নানামুখী ব্যয়। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে ওই ধরনের ব্যয় চলমান থাকে। কিন্তু প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবের সময় সেটি আমলে নেয়া হয় না।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরেও ব্যয় ছাড়া ৩৩৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। সেগুলোর মেয়াদ ৬ মাস থেকে সাড়ে ৩ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৮৪টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রত্যেক বছরই ওই ধারা অব্যাহত আছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরের ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বাড়ানো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্পের মধ্যে থাকা দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পে মেয়াদ বেড়েছে ৩ বছর। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে ২ বছর। তাছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিড নেটওয়ার্কেন পরিবর্ধন এবং ক্ষমতাবর্ধন প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে আড়াই বছর। আমিন বাজার-মাওয়া-মোংলা ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন প্রকল্পে মেয়াদ দেড় বছর বেড়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৬টি পূর্ণাঙ্গ টিভিকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বেড়েছে। নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে ২ বছর, চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স স্থাপন প্রকল্পের ২ বছর মেয়াদ বেড়েছে। ব্যয় ছাড়া হাওড় অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনমান উন্নয়ন (এলজিইডি অংশ) প্রকল্পেরও মেয়াদে বেড়েছে। তাছাড়া রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন সংযোগককারী অবকাঠামো উন্নয়ন, বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, চট্টগ্রাম মহানগরীরর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা (১ম পর্যায়) প্রকল্প, রংপুর বিভাগীয় অবকাঠামো উন্নয়ন (২য় পর্যায়) প্রকল্প, কুমিল্লা কারাগার পুনর্নিমাণ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিপ মডেল টেস্টিং সেন্টার (টোয়িং ট্যাংক) স্থাপন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত সুবিধাদি ও গবেষণা সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে আইএমইডির সচিব আবু হেনা মোর্শেদ জামান জানান, অনেক প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে। তবে অনেক প্রকল্প রয়েছে সেগুলোতে নানা ত্রুটি, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা ও অদক্ষতাও থাকে। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেরি হলে সংশ্লিষ্ট জনগণ যথাসময়ে সুফল বঞ্চিত হয়। প্রকল্পের অনুমোদিত মোট ব্যয় কখনোই বর্ধিত সময়ে বাড়িয়ে খরচ করতে পারবে না। ওই ব্যয়ের ভেতরেই যেসব ব্যয় চলমান না রাখলে হয় না সেগুলো করে থাকে। আইএমইডি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই সুপারিশ দিয়ে থাকে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম জানান, কোনো কোনো প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে। তবে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বাড়লেও খরচ কিন্তু থেমে থাকে না। সেক্ষেত্রে যদি বলা হয় খরচ বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ বৃদ্ধি তাহলে তো কেউ প্রকল্প চালাবেই না। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের থোক বরাদ্দ কিংবা অন্য কোনোভাবে বেঁচে যাওয়া অর্থ চলমান কার্যক্রমগুলোতে ব্যয় করা হয়। পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির উচিত বিষয়টি আরো ভালোভাবে দেখে তারপর সুপারিশ দেয়া।