December 6, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, January 24th, 2022, 9:04 pm

রেলওয়ের দুর্দশার নেপথ্যে আছে রাজনৈতিক প্রভাব

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ রেলওয়ের মেরুদ- সোজা হচ্ছে না। ভগ্নপ্রায় মেরুদন্ড দিন দিন আরও ভেঙ্গে পড়ছে। রেলের এই ভাঙ্গা মেরুদন্ডকে টানতে সরকারকে প্রতিবছর গুণতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। জানা যায়, এক টাকা আয় করতে রেলকে ব্যয় করতে হচ্ছে ছয় টাকা। এই ভয়াবহ লোকসানের অবসান কবে হবে তা বলতে পারছেন না কেউই।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে আয় করেছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যয় করতে হয়েছে ৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি এক টাকা আয় করতে রেল ব্যয় করেছে প্রায় ছয় টাকা। আগের দুই অর্থবছরের চিত্রও প্রায় অভিন্ন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা আয় করতে রেল ব্যয় করে ৫ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। তার আগের অর্থবছরে ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয় ৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। ৩ বছরে ৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা আয় হলেও ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ১৫ হাজার ১৪১ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে রেলকে।
রেলওয়েতে সংযুক্ত আছে অসংখ্য কর্মচারি। প্রায় ৩০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি কাজ করে এই খাতে। তাঁদের বেতন-ভাতা, ট্রেন পরিচালনা ও স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণে সরকারকে প্রতিবছর গুণতে হয় বিপুল টাকা। এ ছাড়া নতুন রেলপথ নির্মাণ, পুরনো লাইন সংস্কার, ইঞ্জিন-বগি কেনা, স্টেশন নির্মাণসহ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে উন্নয়ন খাতে অর্থাৎ বিনিয়োগ হিসেবে। এ ব্যয় ৯ বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, গত ৯ বছরে নতুন রেলপথ বেড়েছে ২৩৬ কিলোমিটার। ডুয়েল গেজ হয়েছে ২৪৮ কিলোমিটার। উন্নয়ন ও পুনর্বাসন করে চালু করা হয়েছে এক হাজার ৯০ কিলোমিটার বন্ধ রেলপথ। স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে ৬৭টি। সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ১৬০টি। ১৭৯টি নতুন রেলসেতু নির্মিত হয়েছে। ৯ বছরে লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) কেনা হয়েছে ৪৬টি। কোচ (বগি) কেনা হয়েছে ২৭০টি। ট্রেন বেড়েছে ১০টি।
বাংলাদেশ রেলকে আধুনিকায়ন করার, উন্নত করার জন্য খরচ যেমন হয়েছে তেমন এতে সক্ষমতা বেড়েছে রেলপথের, কিন্তু ওই আয়টা করতে পারছে না। বিনিয়োগের সাথে তাল মিলিয়ে লাভ নয় যেন লোকসান বাড়ছে। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রেল বছর বছর মুনাফা করছে। ২০১৬ সালে ভারতীয় রেল নিট মুনাফা ২৯ হাজার কোটি রুপি। পণ্য পরিবহনে মুনাফা করেছে ৫৪ হাজার কোটি রুপি। লাভের বড় অংশ তারা ভর্তুকি দিয়েছে যাত্রী পরিবহনে। কিন্তু বাংলাদেশে রেলে পণ্য পরিবহন কমছে বছর বছর।
রেলের এই লোকসান যেমন সরকারকে চিন্তিত করে তুলেছে, তেমনি দেশের বিশেষজ্ঞ মহলও চিন্তিত। তাঁরা লোকসান হ্রাসের জন্য নানা ধরণের পরামর্শও দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, দক্ষতা বাড়িয়ে যাত্রীচাপ কাজে লাগিয়ে অনায়াসেই লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব। অপরিকল্পিত এবং সুদূর প্রসারবিহীন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা, চলমান রেলপথ ও অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবহার না করার কারণেই লোকসানের অঙ্ক বাড়ছে। লোভনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যস্ত সবাই। ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রী, তারা পাচ্ছেন না কাক্সক্ষাত সেবা, বাড়ছে ঋণের বোঝা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান নড়বড়ে রেলপথ, রেল ব্রিজ, ইঞ্জিন-কোচ ও সিগন্যাল ব্যবস্থা সক্রিয় করা গেলে রেলের গতি অনেক বাড়ানো যেত। কমিয়ে আনা সম্ভব লোকসানও। সেদিকে কারও নজর নেই। সবাই বড় বড় প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। বর্তমানে ২৫৯টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। মালবাহী ট্রেন চলছে ৩৮টি। প্রতিটি যাত্রীবাহী ট্রেন নূন্যতম ১৬-২০টি কোচ নিয়ে চলার কথা। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১০৪টি আন্তঃনগর ট্রেন গড়ে ৭-১৪টি বগি নিয়ে চলছে। শুধু চলমান আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতেই আরও প্রায় ৭৩০টি কোচ সংযুক্ত করা সম্ভব। এতে প্রতিদিন প্রায় ৭৩ হাজার যাত্রী বেশি পরিবহণ করা সম্ভব। এতে আন্তঃনগর ট্রেন থেকে দিনে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় করা যায়। বাকি ২৫৫টি মেইল, কমিউটার এবং লোকাল ট্রেন ৩-৭টি কোচ নিয়ে চলাচল করছে। এসব ট্রেনে গড়ে ৬টি করে কোচ সংযুক্ত করলে ১৫৩৯টি অতিরিক্ত কোচ সংযুক্ত করা যায়।
শেখ হাসিনার সরকার অবকাঠামোর চরম উন্নয়ন সাধনে বহুমুখী কাজ করেছে এবং এখনো অনেক কাজ চলমান রয়েছে। রেলের উন্নয়নে বর্তমান সরকার আমূল পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে বলে পরিবহণ ও মেকানিক্যাল দপ্তর সূত্রে জানা যায়। জানা যায়, সরকার বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পও বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সরকারের এত প্রচেষ্টার পরও রেলপথ ঝুঁকি থেকে বের হতে পারছে না। বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ৩০ বছরের মাস্টারপ্ল্যানে (২০১৫-২০৪৫) সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।
তবে সরকারের রেল উন্নয়ন প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতিতে এই প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখছে না। কাজ হচ্ছে নামকে ওয়াস্তে। রেলওয়ে অবকাঠামো দপ্তর সূত্রে জানা যায়, কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের সঙ্গে নামেমাত্র ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কোচ-ইঞ্জিন ক্রয়ে প্রাধান্য না দিয়ে নতুন রেলপথ, ভবন নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চাহিদার আলোকে কোচ-ইঞ্জিন ক্রয় এবং চলমান রেলপথের সংস্কার করে এ রেলপথেই প্রায় দ্বিগুণ ট্রেন চালানো সম্ভব। এখনো রেলের প্রায় ৬ হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। জমি উদ্ধার করে তা কাজে লাগিয়ে এবং কোচ সংযুক্ত করে আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব অনায়াসেই।
রেলওয়ের এই দুর্দশার নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবও বড় একটি ফ্যাক্টর। দীর্ঘ ও চাহিদাসম্পন্ন রুটে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ট্রেন সংখ্যা কম চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। কম গুরুত্বের পথেও আসন সংখ্যা খালি রেখেই একাধিক ট্রেন চালানো হচ্ছে। অথচ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পথেও ট্রেন বাড়ানো হচ্ছে না। যেমন ঢাকা থেকে চিলাহাটি দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম রেলরুটে নীলসাগর এক্সপ্রেস নামে দিনে মাত্র ১টি ট্রেন রয়েছে। এ পথে যাত্রী চাহিদা যুগের পর যুগ থাকলেও নতুন ট্রেন দেওয়া হচ্ছে না। যাত্রীদের অভিযোগ, নীলসাগর এক্সপ্রেসে যত আসন তা চাহিদার এক-তৃতীয়াংশও নয়। চিলাহাটির যাত্রীদের জন্য রয়েছে অল্প কিছু বরাদ্দ সিট। অথচ চিলাহাটির মানুষ সিট সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরে হাহাকার করছে। আসনের দ্বিগুণের বেশি যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি চলাচল করে, কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রীর (বিনা টিকিট) টাকা বলতে গেলে রেল পায় না। এর ওপর সম্প্রতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুটি বগি ওয়ার্কশপে পাঠানোয় এর পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে।
এটি স্পষ্ট যে, রেলকে বাঁচাতে হলে মালামাল পরিবহন বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। এখন সব চাপ পড়ছে সড়কে। এভাবে সড়কে চাপ বাড়লে সড়কও ভেঙে পড়বে। তাই রেলে মালামাল পরিবহন বৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত একটি করপোরেশন গঠনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।