December 8, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Monday, October 4th, 2021, 7:09 pm

রেলের লেভেল ক্রসিংগুলোতেই বেশি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈধ-অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোতেই বেশি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। রেলওয়ের হিসাবে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১৫৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে রেলগেটে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ওই সময়ে পারাপারেরকালে রেলগেটের ওপর গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে বেশকিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থার জন্য সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া রেললাইনের বাড়তি উচ্চতাকে দায়ি করা হচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের দুই জোনে (পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল) ১ হাজার ৪১২টি বৈধ লেভেল ক্রসিং আছে। তার মধ্যে মাত্র ৪৪৮টিতে গেটকিপার আছে। বাকিগুলোয় ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন পারাপার হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রেললাইনে প্রায় দেড় হাজার বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি সারা দেশে ১ হাজার ৮৫টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। তার কোনোটিতেই গেটকিপারের বন্দোবস্ত নেই। শুধু পারাপারের পথে ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং লেখা সাইনবোর্ড দিয়ে দায় সেরেছে রেলওয়ে। পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী) রেলওয়েতে বৈধ কিন্তু গেটকিপার নেই এমন লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেশি। ৯৭৮টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ২২১টিতে গেটকিপার আছে। আর পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম) ৪৩৪টির মধ্যে ২৪৫টি লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপার আছে।
সূত্র জানায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রেলপথে সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেভেল ক্রসিং বানিয়েছে। সারা দেশে সংস্থাটির ৪৫২টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং আছে। অর্থাৎ ওসব লেভেল ক্রসিং বাংলাদেশ রেলওয়ে অনুমোদিত নয়। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের ৩৬৩টি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১১টি, পৌরসভার ৭৯টি, সিটি করপোরেশনের ৩৪টি, জেলা পরিষদের ১৩টি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ৩টি, বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি, জয়পুরহাট চিনিকলের একটি, ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের ৩টি ও অন্যান্য রয়েছে ৯২টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। তাছাড়া রেলওয়ে ৩৩টি লেভেল ক্রসিংয়ের মালিকানাই জানতে পারেনি। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোর সিংগভাগই গড়ে উঠেছে। ওই অঞ্চলে অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৮১১টি। লেভেল ক্রসিংগুলোর বাড়তি উচ্চতা, বিপুলসংখ্যক অবৈধ লেভেল ক্রসিং গড়ে তোলা ও সেগুলো পরিচালনায় পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে রেলগেটে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে।
সূত্র আরো জানায়, বিগত ৭ বছরে সারা দেশে লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের ১৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওসব দুর্ঘটনায় ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার বাইরে একই সময়ে সিগন্যাল অমান্যের জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০টি আর তাতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে লাইনচ্যুতির ঘটনা। ৭ বছরে ৮৫৬টি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। ওসব দুর্ঘটনায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে ওই সময়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে বাংলাদেশ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংগুলোর উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সড়কের ওপর দিয়ে রেলপথ গেলে ওই রেলপথের উচ্চতা সড়কের সমান রাখতে হয়। কিন্তু নিয়ম থাকলেও এদেশে তা মানার প্রবণতা একেবারেই কম। কোনো ধরনের আদর্শ নকশা না করে ও কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই বেশির ভাগ লেভেল ক্রসিং তৈরি করা হয়েছে। স্বভাবতই ভুল নকশা আর ভুল পরিকল্পনায় নির্মাণ করা ওসব লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে বেশি। তাছাড়া সড়কের চেয়ে সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া রেলপথের উচ্চতা বেশি হলে স্বাভাবিকভাবেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। মূলত সমস্যাটি বেশি হয় ভারী যানবাহন লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময়। ভারী গাড়ির ভর বেশি থাকায় সেগুলো উঁচু লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় প্রচ- ঝাঁকুনি খায়। আর ওই ঝাঁকুনির কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার আশপাশে কোনো ট্রেন থাকলে গাড়িচালকের মানসিকতায়ও একটা বিরূপ প্রভাব ফেলে। তখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে চলাচল করা ভারী যানবাহনগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াও এ ধরনের দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। সামগ্রিকভাবে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সড়কের উচ্চতার সঙ্গে রেলপথের উচ্চতা সমান করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি লেভেল ক্রসিং নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে এবং সঠিক পরিকল্পনা ও নকশায় সেগুলো নির্মাণ করতে হবে। লেভেল ক্রসিং এলাকায় সড়কের পিচ ঢালাইয়ে বিটুমিনের বদলে কংক্রিট ব্যবহার করা উচিত।
অন্যদিকে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের দাবি, ট্রেন দুর্ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। ভবিষ্যতে ট্রেন দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ট্রেন দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ, রেলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ, প্রদেয় ক্ষতিপূরণ, দায়ি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ওসবের পাশাপাশি দুর্ঘটনা রোধে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।