November 27, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Sunday, August 1st, 2021, 8:25 pm

লং কোভিড রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি নতুন শঙ্কা জাগাচ্ছে

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

করোনার ঊর্ধ্বগতিতে দেশে লং কোভিড রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লং কোভিড দেশে নতুন করে উদ্বেগের বিষয় হতে যাচ্ছে। কোভিডের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লং কোভিডের বিষয়টি খেয়াল করেছিল। ভারতের চিকিৎসকদেরও লং কোভিড নজরে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে লং কোভিডের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী কেউ যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর তা গুরুতর বা মৃদু যাই হোক না কেন- ১২ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও যদি রোগীর দেহে এমন অসুস্থতার লক্ষণ রয়ে যায়, যার কারণ হিসেবে অন্য কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে ধরে নিতে হবে তার লং কোভিড হয়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়েও নানা ধরনের শারীরিক জটিলতাই মূলত লং কোভিডের লক্ষণ আর বাংলাদেশে কোভিড আক্রান্তদের এক বড় অংশের মধ্যেই নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, লং কোভিডের লক্ষণগুলো হচ্ছে- চরম ক্লান্তি বা অবসন্নতা। শ্বাস নিতে কষ্ট বা হাঁপিয়ে ওঠা, হৃৎপিন্ডের ঘন ঘন স্পন্দন বা বুক ধড়ফড় করা, বুকে ব্যথা বা টানটান ভাব। স্মৃতি শক্তি বা মনোসংযোগের সমস্যা, যাকে বলা হয় ব্রেন ফগ বা বোধশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া। স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিতে পরিবর্তন। হাড়ের জোড়ায় ব্যথা। বিভিন্ন জরিপে রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী লং কোভিডের এ রকম শত শত লক্ষণ ও নানা অসুস্থতার অভিযোগ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম জরিপটি চালিয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং তারা লং কোভিডে আক্রান্ত লোকদের ১০টি পত্যঙ্গে আঘাত হানে এরকম ২০০টি লক্ষণ চিহ্নিত করেছে। দেখা গেছে যারা করোনা সংক্রমণের পর পুরোপুরি সেরে উঠেছে তাদের চাইতে লং কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেই ওসব লক্ষণ বেশি দেখা গেছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাংলাদেশে করা এক গবেষণায় বলা হয়, যারা কোভিড আক্রান্ত হয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশের মধ্যে লং কোভিডের উপসর্গ রয়েছে। এমনকি যারা মৃদু উপসর্গ থাকার ফলে কোভিড পরীক্ষা করায়নি তাদের মধ্যেও লং কোভিডের উপসর্গ রয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই দেশে দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বজুড়েই কোভিডের পর এখন ই লং কোভিড মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে লং কোভিড মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। ভারতে ই লং কোভিডের প্রভাব পড়েছে। সেখানে হঠাৎ করেই স্থায়ুবিক, মানসিক রোগে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
সূত আরো জানায়, বাংলাদেশের যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৭ জন গবেষকের একটি দল লং কোভিড নিয়ে গবেষণা করেছেন। ২০২০ সালের মে মাস থেকে শুরু করে এ বছরের মে মাস পর্যন্ত এক বছর ধরে এ গবেষণা চালানো হয়েছে। বাংলাদেশের দুই হাজারের বেশি কোভিড রোগীর ওপর গবেষণাটি করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ১৫ শতাংশ কোভিড রোগী লং কোভিডে ভুগছে। যুক্তরাজ্যে মোট আক্রান্ত কোভিড রোগীদের মধ্যে এ হার বাংলাদেশের তুলনায় কম। সেখানে ১০ শতাংশের কিছু বেশি রোগীর মধ্যে লং কোভিডের উপসর্গ পাওয়া গেছে মাত্র। লং কোভিডের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, ভুলে যাওয়া, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, হৃৎস্পন্দনের ওঠানামার মতো উপসর্গ থাকে। আর এটি ৩ মাস থেকে শুরু করে দেড় বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাছাড়া হাসপাতালে দীর্ঘদিন ভেন্টিলেটারে থাকার পর তৈরি হতে পারে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতা। এখন পর্যন্ত কোভিডের যাদের বয়স বেশি কিংবা আগে থেকেই কোন ধরনের শারীরিক সমস্যা থাকে তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। তবে লং কোভিডের এই যুক্তি সবসময় খুব একটা কাজ করে না। আর গবেষণা অনুযায়ী মধ্যবয়সীদের মধ্যেই লং কোভিডের উপসর্গ বেশি পাওয়া যায়। ৩০ থেকে শুরু করে ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত মানুষের মধ্যে লং কোভিডে ভোগার প্রবণতা বেশি। অথচ এদেশে ওই বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে থাকে এবং অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। লং কোভিডের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণত কোভিড নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি হয়, কিন্তু লং কোভিডের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। লং কোভিডে আক্রান্তের প্রবণতা পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে বেশি। এর কারণ হিসেবে তারা ধারণা করা হচ্ছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা শারীরিক কর্মকা-ে কম অংশ নেয়া এবং পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার পুরুষদের তুলনায় কম গ্রহণ করার সম্পর্ক থাকতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লং কোভিড মানুষের শারীরিক ও মানসিক-দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কোভিড আক্রান্ত মানুষ সুস্থ হওয়ার অনেক দিন পর্যন্ত তার শরীরে নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতা থাকে।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হেলথ এ্যান্ড হোপ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ লেলিন চৌধুরী জানান, লং কোভিডের কারণে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় রোগীর ঘুম কম হতে পারে, মাঝে অনেক বেশি উত্তেজিত হয়ে যায়, আবার অনেক সময় হতাশ হয়ে যায়। একে বলা হয় ভাবনার ওঠানামা। কখনও রাগ খুব বেড়ে যায়, কানে ঝি ঝি শব্দ করে, মাথা ঘোরে, বমি ভাব হয়, বুক ধড়ফড় করেÑ এগুলো স্নায়ুতন্ত্রীয়। তাছাড়া বংশগত রোগ থাকলে সেটিও লং কোভিডের কারণে প্রকাশিত হয়।