May 28, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Thursday, March 3rd, 2022, 10:08 pm

সবচেয়ে বড় আইসের চালান জব্দ, সমুদ্রে মাছ ধরার আড়ালে পাচার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ থেকে গভীর সমুদ্রে জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার আড়ালে ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ও ইয়াবা সংগ্রহ করে বিভিন্ন কৌশলে রাজধানী ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে সরবরাহ করে আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় মাদকের চালান নিয়ে আসার সময়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড আ্যকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। র‌্যাব বলছে, মাদক কারবারি এই চক্রে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। র‌্যাবের অভিযানে কয়েকজন পালিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হন চক্রের মূলহোতা জসিম উদ্দিন ওরফে জসিম (৩২)। জসিমের অন্যতম সহযোগী মকসুদ মিয়া (২৯), রিয়াজ উদ্দিন (২৩), শাহিন আলম (২৮) ও সামছুল আলম (৩৫)। তাদের সবার বাড়ি কক্সবাজারের সোনাদিয়ায়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দেশের সর্ববৃহৎ আইসের চালান ১২ কেজি আইস (যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকার বেশি), এক লাখ পিস ইয়াবা, ৪ হাজার ৬০০ পিস চেতনানাশক মাদক সিডাকটিভ ইনজেকশন, দুটি বিদেশি পিস্তল, নয় রাউন্ড গুলি, দুটি টর্চলাইট, মিয়ানমারের সিমকার্ড, এক লাখ ৬৪ হাজার বাংলাদেশি টাকা ও এক লাখ মায়ানমারের মুদ্রা ও পাঁচটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। বৃহস্পতিবার (৩ রা মার্চ) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কামন্ডার খন্দকার মঈন। তিনি বলেন, বৈধ ব্যবসা ও মাছ ধরার আড়ালে সাগর পথে একটি চক্র মিয়ানমার থেকে আইস ও ইয়াবা বাংলাদেশে নিয়ে আসছে একটি চক্র। এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছে র‌্যাব-১৫ এর একটি দল। এ সময় এ চক্রের মূলহোতা ও সমন্বয়কারী জসিমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে ট্রলারের মাধ্যমে মিয়ানমারের মাদক চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশের এই চক্রের কাছে ইয়াবা ও আইসের চালান হস্তান্তর করে। সাগর পথে মাদকের চালান গ্রহণ ও নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য এ চক্রের সদস্যরা ২০ থেকে ২৫ দিন জেলে ছদ্মবেশে গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে। মাদক গ্রহণের পর সুবিধাজনক সময়ে তারা সোনাদিয়া দ্বীপে চলে আসে। পরে সেগুলো সোনাদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা হয়। এরপর সুবিধাজনক সময়ে চক্রটি সোনাদিয়া থেকে দুটি বোটের মাধ্যমে নোয়াখালীর হাতিয়া নিয়ে আসে। হাতিয়ায় থাকা চক্রের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে মাদকের চালান সংরক্ষণ করা হয়। এরপর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে মেঘনা নদী হয়ে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হতো। ঢাকা ছাড়াও চক্রটি বরিশাল ও পটুয়াখালী অঞ্চলে মাদক সরবরাহ করতো। মাদকের চালান মুন্সিগঞ্জে পৌঁছানোর পর রাজধানীর একটি চক্র আইস ও ইয়াবার চালান গ্রহণ করে এবং সড়কপথে বিভিন্ন মাধ্যমে কৌশলে মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। নৌপথে মাদক পরিবহনে তারা বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দেয়ার জন্য চক্রটি দুটি বোট ব্যবহার করে থাকে। সামনের বোটটিকে তারা নজরদারি করতে ব্যবহার করত এবং পরের বোটটিতে মাদক বহন করা হতো। মোবাইল অথবা টর্চ লাইট সিগন্যালের মাধ্যমে উভয় বোটের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করত। পথিমধ্যে নজরদারিতে নিয়োজিত বোট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহজনক কিছু আঁচ করতে পারলে পেছনের মাদকবাহী বোটকে সংকেত দিতো। গ্রেপ্তারের পর চক্রের সদস্যদের বরাত দিয়ে খন্দকার মঈন জানান, চক্রের নেতৃত্ব দিতেন জসিম উদ্দিন। তার নেতৃত্বে মাদক চক্রের ১২ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। এই চক্রটি মূলত সোনাদিয়া কেন্দ্রিক একটি মাদক চোরাকারবারি চক্র। তারা নৌপথ ব্যবহার করে বিভিন্ন কৌশলে মিয়ানমার থেকে মাদক নিয়ে আসত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সম্প্রতি তারা নৌপথকে প্রাধান্য দিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক সরবরাহ করত। র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার জসিম ৫ থেকে ৭ বছর থেকে মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। লবণ ব্যবসার আড়ালে আইস কারবারে জড়িত। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে ক্রিস্টাল আইসের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছর থেকে তারা মিয়ানমার থেকে ক্রিস্টাল আইস নিয়ে আসা শুরু করে। এ ছাড়া এই চক্রটির জসিম রাজধানী থেকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের চেতনানাশক মাদক সিডাক্সিন ইনজেকশন সংগ্রহ করে নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিতো। তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তার শাহীন আলম জসিমের অন্যতম প্রধান সহযোগী। সে সাগর ও নৌপথে মাদক পরিবহনের মূল দায়িত্ব পালন করে। তার বিরুদ্ধে মহেশখালী থানায় মানবপাচার ও মারামারির দুটি মামলা আছে। শামছুল আলম এর বিরুদ্ধে মহেশখালী থানায় অস্ত্র ও মারামারির তিনটি মামলা আছে। মকসুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও ডাকাতির ছয়টি মামলা আছে। শাহীন, সামসু ও মকসুদ মাদক বহন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতো। রিয়াজ উদ্দিন মাদক পরিবহনে নজরদারির জন্য বোটে অবস্থান করতো। র‌্যাব জানায়, বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ঢাকা পর্যন্ত এমন বড় বড় মাদকের চালন নিয়ে আসে। তারা কোথাও ম্যানেজ কিংবা অপকৌশল করে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, অবশ্যই অপকৌশল। যারা মাদক চোরাকারবারি করছে তারা কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মাদকের চাহিদা অনুযায়ী তারাও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এসব মাদক বহন করছে। তারা আড়াই হাজার টাকা দিয়ে যে মাদকটি কিনে সেটি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে। এখানে মুনাফার পরিমাণটা অনেক বেশি। আমাদের সমাজে যারা মাদক সেবন করে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সেবনের চাহিদা আমরা কমিয়ে নিয়ে আসতে না পারি ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন অপকৌশলে তারা মাদক নিয়ে আসবে। তারা রূপ পরিবর্তন করছে, কৌশলও পরিবর্তন করছে। শুঁটকির ভেতরে, ফলের ভেতরে করে মাদক নিয়ে আসে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সকলের সহযোগিতায় বিশেষ করে র‌্যাব সতর্ক ছিল বলেই বড় বড় চালান নিয়ে মাদক কারবারিরা আটক হচ্ছে। আমরা সামনেও যারা এসব কাজে লিপ্ত হবে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা কী ঢাকাকে টার্গেট করেই এসব চালান নিয়ে আসছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আল মঈন বলেন, পুরোটা যে ঢাকার জন্য আনা হয়েছে তা না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী এখান থেকেই বিভিন্ন জায়গায় মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার বাইরেও যাবে। কীভাবে সেটা যাবে নৌপথে নাকি সড়কে সেটা তাদেরকে আরও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে। টাকা হস্তান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চক্রটি যেভাবে মাদক পাচার করছিল। ঠিক সেভাবেই হাতে হাতে মাদক বিক্রি শেষে টাকা পরিশোধ করতো। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমেও মাদকের টাকা পরিশোধ করা হতো। প্রথমে ২০ থেকে ৩০ ভাগ দাম অগ্রিম দিয়ে মাদক নিয়ে আসে। প্রতি ১০ গ্রাম কিনে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় কেনে। যা দেশে এনে ২৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতো। র‌্যাব আরও জানায়, বৈধ ব্যবসার আড়ালে মাদক সংগ্রহ করতো জসিমের নেতৃত্বে থাকা চক্রটি। তারা প্রতিটি চালান সংগ্রহে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় নিতো। সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের বেশে তারাও মাছ ধরতে যেতো। তারা এমনভাবে কাজ করতো যেনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে না পড়ে।