December 9, 2021

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Friday, November 5th, 2021, 12:13 pm

সমন্বয়ের অভাবে লেজেগোবরে অবস্থায় শিক্ষার্থীদের টিকাদান কার্যক্রম

ফাইল ছবি

করোনা মহামারী এখনো নিঃশেষ হয়নি। এর প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাজধানীর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সোমবার রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ রয়েছে এর সমন্বয়ের দায়িত্বে। তবে শুরুতেই তিন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতায় পুরো বিষয়টি লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের পুরো তথ্য এখনও কোনো মন্ত্রণালয়ের হাতেই নেই। টিকাদানের স্থান পছন্দের ক্ষেত্রেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পছন্দ করা স্থান পছন্দ হয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। আবার তাদের পছন্দ করা স্থান টিকাদানের জন্য প্রস্তুত করা হলেও তাতে বাদ পড়েছে পুরোনো ঢাকার বড় একটি অংশের শিক্ষার্থীরা। টিকা নেওয়ার জন্য তাদের কাছাকাছি কোনো ভেন্যুই নির্ধারণ করা হয়নি।

অন্যদিকে টিকাদানের জন্য যেসব স্থান পছন্দ করা হয়েছে, সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের জানানো হয়েছে অনেক দেরিতে। আবার স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকাদানের জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হলেও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি। রাজধানী ঢাকায় স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের টিকাদান কার্যক্রম মঙ্গলবার শুরু হলেও, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের কবে টিকা দেওয়া শুরু হবে, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সন্তানদের টিকা দেওয়া নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও রয়েছে সিদ্ধান্তহীনতা।

টিকাদানের প্রস্তুতিতে এমন সমন্বয়হীনতার মধ্য দিয়েই সোমবার স্কুল ও কলেজের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী তাহসান হোসেন ও মাহজাবিন তমা প্রথম টিকা নেয়। তাদের ফাইজারের টিকা দেওয়া হয়। সোমবার বিকেলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিচালক অধ্যাপক বেলাল হোসাইন বলেন, শুরুতে কিছু সমস্যা থাকতে পারে, তবে তা সমন্বয়হীনতা নয়। মঙ্গলবার থেকে রাজধানীর আটটি স্থানেই একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। এজন্য সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

যে আটটি কেন্দ্রে মঙ্গলবার থেকে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবার কথা, সেগুলো হলো- মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (ভাটারা), সাউথ পয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (মালিবাগ), চিটাগং গ্রামার স্কুল (বনানী), কাকলি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (ধানমন্ডি), ঢাকা কমার্স কলেজ (চিড়িয়াখানা রোড), স্কলাস্টিকা (মিরপুর-১৩) ও সাউথ ব্রিজ স্কুল (উত্তরা)।

এ ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল মজিদের ভাষ্য, মূলত সময় হাতে কম পাওয়ায় সব কিছু সুচারুভাবে যথাসময়ে সম্পন্ন করা যায়নি। সময় আরেকটু বেশি পেলে ভালো হতো।

মাত্র আটটি স্থান বা কেন্দ্র দিয়ে পুরো রাজধানীর সব শিক্ষার্থীর টিকাদান নিশ্চিত করা একপ্রকার অসম্ভব। এ ব্যাপারে এই কর্মকর্তা বলেন, তা নিশ্চয়ই নয়। কেন্দ্র আরও বাড়াতে হবে। এখন দিনে ৪ থেকে ৫ হাজার শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া সম্ভব। পুরান ঢাকা এলাকায় একটিও ভেন্যু নেই, সে কারণে আমরা আহমদ বাওয়ানী একাডেমিতে ১০টি বুথ চালুর চেষ্টা করছি।

মাউশি জানায়, রাজধানীতে ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় লাখের মতো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৭০০টি। এর মধ্যে চার লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করেছে অধিদপ্তর। তবে তাদের মধ্যে নিবন্ধন করেছে এক লাখ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১৩ অক্টোবর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তথ্য চাওয়া হয়। ১৯ অক্টোবরের মধ্যে তথ্য দিতে বলা হয়। কিন্তু ২০ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্গাপূজার ছুটি ছিল। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা যথাসময়ে চিঠির কথা জানতে পারেননি। যখন পেরেছেন তখন তারা তথ্য দিতে শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকায় তারা অনেক শিক্ষার্থীর তথ্য পাননি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত এক্সেল শিটে তথ্য দিতে গিয়েও অনেকে ভুল করেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ সেসব ভুল ঠিক করে সঠিক ফরম্যাটে আনে। এতেও কিছুটা সময় নষ্ট হয়েছে।

মাউশি সূত্রে জানা গেছে, নানা বিবেচনায় রাজধানীর মোট ৮৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করে মাউশি থেকে টিকাদানের কেন্দ্র করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছিল। তারা মাউশিকে জানায়, এত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। তারা প্রতিষ্ঠান কমিয়ে নতুন তালিকা দিতে অনুরোধ করলে মাউশি ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা দেয়। তা থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৯টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে আটটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে। এর মধ্যে কোনোটিই পুরান ঢাকায় নয়। ফলে পুরান ঢাকা, লালবাগ, সূত্রাপুর, বংশাল, কোতোয়ালি, চকবাজার ও যাত্রাবাড়ী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী বিপাকে পড়ে যায়।

সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাড়াহুড়ো করে সোমবার এ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। এখনও প্রস্তুতিতে নানা ঘাটতি রয়ে গেছে। যেমন- গত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) আইসিটি বিভাগ সুরক্ষা অ্যাপসে তথ্য দেয়। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরা জানতে পারেন, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুরক্ষা অ্যাপস খুলে দেওয়া হয়েছে। তখন হুড়োহুড়ি করে যে শিক্ষার্থীরা পেরেছে, তারা নিবন্ধন করেছে। তাদের দিয়েই সোমবার টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।

কয়েকজন শিক্ষক জানান, আগে জানানো গেলে আরও বেশি শিক্ষার্থী নিবন্ধন করতে পারত। সোমবার রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দিয়ে দেখা গেছে, টিকাদান শেষেও আরও অন্তত ৩০০ শিক্ষার্থী বেশি ছিল, যারা টিকার জন্য অপেক্ষা করছিল। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগমের ভাষ্য, যারা সোমবার টিকা পায়নি, তাদের মঙ্গলবার টিকা দেওয়া হয়েছে।

একাধিক শিক্ষক জানান, অভিভাবকরা এখনও সন্তানদের টিকা দেবেন কিনা, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। এ কারণেও নিবন্ধন কম। এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলুর ভাষ্য, অভিভাবকদের বেশিরভাগই টিকা দিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। যারা সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন, তারাও শিগগিরই সন্তানের মঙ্গলের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করছি।

আরও যত সংকট :স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও দেওয়া শুরু হয়েছে শুধু ঢাকায়। সারাদেশে কবে তা শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীর টিকাদান কবে হবে, তা নিশ্চিত নন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা। কারণ, ঢাকার বাইরে থেকে এখনও শিক্ষার্থীদের তথ্য এসে পৌঁছায়নি। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র একটি জেলার তথ্য এসেছে।

মাউশির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট খন্দকার আজিজুর রহমান জানান, ঢাকা মহানগরীর আট কেন্দ্রের প্রতিটিতে বুথ ২৫টি এবং প্রতি বুথে দৈনিক সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ হারে টিকা দিলে রাজধানীর শিক্ষার্থীদের টিকা দিতে তিন মাসের বেশি লাগার কথা।

আবার স্কুল-কলেজে শুরু হলেও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের টিকাদানের কোনো উদ্যোগ এখনও নেই। সংখ্যায় এই শিক্ষার্থীরাও বিপুলসংখ্যক। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকার ৬৯টি মাদ্রাসা থেকে ১২-১৭ বছর বয়সী ১২ হাজার ৩৫৪ শিক্ষার্থীর তথ্য অধিদপ্তরের কাছে এসেছে। তারা সেগুলো আইসিটি বিভাগে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে ঢাকার বাইরে ৬৪ জেলার মধ্যে তথ্য এসেছে মাত্র ৩৪ জেলার। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এখনও টিকার তারিখ হয়নি বলে জানিয়েছেন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কে এম রুহুল আমিন।

জানা গেছে, স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টিকাও এ মুহূর্তে সরকারের হাতে নেই। ফাইজার-বায়োএনটেকের ৭০ লাখের বেশি ডোজ টিকা পেয়েছে বাংলাদেশ। এর পুরোটাই এসেছে কোভ্যাক্সের মাধ্যমে। এর মধ্যে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৩২ ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। ৬০ লাখের বেশি টিকা মজুদ আছে। এ মাসেই ফাইজারের আরও ৩৫ লাখ ডোজ টিকা দেশে আসবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

টিকার এই স্বল্পতায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের শুরুতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সোমবার রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১২-১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনার টিকা দেওয়া হবে। ১৪ নভেম্বর পরীক্ষা শুরুর আগে এ স্তরের শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম শেষ করার চেষ্টা করা হবে। তার সঙ্গে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও টিকা দেওয়া হবে।

এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, যেসব শিশু স্কুলে যায় না, ঝরেপড়া তাদেরও টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ফাইজারের টিকা আছে, পাইপলাইনে আরও আছে। সারাদেশে সকল শিশুকে টিকা দিতে তিন কোটি টিকা প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীও টিকার বাইরে থাকবে না।

পরে বেলুন উড়িয়ে টিকা কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান, মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার, ইউএস এআইডি প্রতিনিধি, ইউনিসেফ প্রতিনিধি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।