May 23, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, April 12th, 2022, 5:07 pm

সুনামগঞ্জে ঝুঁকিতে বোরো ফসল, আতঙ্কে কৃষক

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর হাওর এলাকার কৃষকরা আশঙ্কা করছেন যে তারা এই বছর বোরো ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না। ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সামনের দিনগুলোতে এখানে আরও আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলার বোরো ধান পাকতে শুরু করেছে। সাধারণত, হাওর এলাকার কৃষকরা ৭-১০ দিনের মধ্যে ফসল কাটা শুরু করবেন। তবে হাওরে অকালবন্যার পানি নামতে না নামতেই আরেকটি ঢল আসার আশঙ্কা ফসলের সম্পূর্ণ ক্ষতি করতে পারে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং অন্যান্য বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের উত্তর এবং উত্তরপূর্বাঞ্চল, তদসংলগ্ন ভারতের আসাম এবং মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটার কয়েকটি পয়েন্টের পানি বিপদসীমানা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। ফের আবহাওয়া অধিদপ্তরের এমন পূর্বাভাসে আতঙ্কে দিন-রাত কাটাচ্ছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।

গত এক সাপ্তাহের ব্যবধানে উপজেলার নজরখালীর বাঁধ ভেঙে টাংগুয়ার হাওর, এরালিয়াকোনা, গুন্নাকুড়ি হাওরের প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে গেছে। অবশিষ্ট বাঁধ গুলো পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিভিন্ন বাঁধে ধস ও ফাটল দিখা দিচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক তাহিরপুর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত ও সংস্কার করতে এবছর ৬৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) দ্বারা ৫৩ কিলোমিটার ডুবন্ত ফসল রক্ষা বাঁধ ও ১০টি ক্লোজার মেরামত করা হয়। এতে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আর এসব বাঁধের কাজ সময় মতো শুরু ও শেষ না হওয়ায় বাঁধ গুলো মজবুত হয়নি। ফলে বাঁধ দুর্বল থাকায় পাউবো’র ৬৮টি বাঁধেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন হাওরপারের কৃষকরা। আর বাঁধের ধসে পড়া ও ফাটলের স্থানে বাঁধ মেরামতের কাজ করছেন স্থানীয় কৃষকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এদিকে মাঘ মাসের শেষের দিকে স্থানীয়রা তাহিরপুর উপজেলার মহালিয়া হাওরের ময়নাখালি বিল সেচে মাছ ধরায় বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে ময়নাখালি বাঁধটি।

বাঁধ ভেঙে কৃষকের ক্ষতি হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) নামে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা গরিব কৃষকদের নাম ব্যবহার করে প্রকল্প নিয়ে সরকারি টাকা লুটপাট করে লাভবান হয়েছেন, এমন অভিযোগ এখন হাওরাঞ্চলের সর্বত্রই।

১৬ নং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও বর্ধিত গুরমার হাওরের কৃষাণি সাহিদা আক্তার লাকী বলেন, সময় মত বাঁধ নির্মাণ করার টাকা না পাওয়ায় বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লেগেছে। এই অতিরিক্ত সময় লাগায় বাঁধ মজবুত হয়নি। তবে যদি বাঁধ কোনো ভাবে ভেঙে যায় দায় কিন্তু আমরা নিবো না। কারণ সময় মতো কর্তৃপক্ষ টাকা না দেয়ায় দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

দুর্নীতির প্রতিবাদে ও পিআইসিদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন তাহিরপুরে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের তাহিরপুর উপজেলা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, টাংগুয়া হাওরসংলগ্ন গনিয়াকুড়ি, এরালিয়াকোনা, নান্দিয়া, লামারগুল, টানেরগুল, রাঙ্গামাটিয়া, ফলিয়ার বিল, সন্যাসি এসব হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রকল্প নেই। এসব হাওর বোরো ধান চাষ করা কৃষকরা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় পার করছে। বাকি বাঁধ গুলো রক্ষা করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসান উদ দৌলা জানান, এবার ছোট বড় ২৩টি হাওরে বোরো কৃষকরা ১৭,৪৯৫ হাজার হেক্টর জমি চাষ করেছেন। এতে চাল উৎপাদন হবে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। আমরা সার্বক্ষণিক খবর রাখছি বাঁধের বিষয়ে। এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাওয়া ৩টি হাওরের বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে এক শত হেক্টর।

শনির হাওরের কৃষক মুশাহীন মিয়া বলেন, ‘আমরা এখনো ধান কাটিনি। কিন্তু হাওরের পানির উচ্চতা প্রতিদিনই বাড়ছে। বেড়িবাঁধে ফাটল সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় আমরা একটি সংকটময় সময় পার করছি।’

এসময় তিনি দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পিআইসি ও কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তাহিরপুর উপজেলা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে অনিয়মকারীদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বাঁধ টিকিয়ে রাখতে সবোচ্চ চেষ্টা করছি। আশা করছি কৃষকদের আর কোনো ক্ষতি হবে না।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘প্রতিটি বাঁধ রক্ষায় প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষ কাজ করছেন। বাঁধগুলো এখনও টিকিয়ে রেখেছেন তারা। আমি নিজেও বাঁধ তদারকি করছি। কৃষকসহ সবাইকে হাওরের ফসল রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছি। তবে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও গাফিলতি যারা করেছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না।’

—ইউএনবি