January 25, 2022

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Wednesday, December 15th, 2021, 9:22 pm

স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ব্যয় কমলেও ব্যক্তিখাতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছেই

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ব্যয় কমলেও ব্যক্তিখাতে তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ, পথ্য সরবরাহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে সেবা নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে প্রতি বছর ৮৬ লাখের বেশি মানুষের আর্থিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ১৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেয় না। ওই হিসাবে প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রয়োজন হলেও চিকিৎসা নিচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণাপত্রে বলা হয়েছে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ব্যক্তির ওপর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমাতে হবে। কিন্তু এদেশে বিপরীত। ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ না কমে বরং দিন দিন বাড়ছে। আর সরকারের ব্যয় কমছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের গ্রামাঞ্চলে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন সাব সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতাল এবং নগরাঞ্চলে থাকা নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র, নগর প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ডেলিভারি সার্ভিসেস প্রজেক্ট ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরকারিভাবে মোট জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। বাকি ৬০ শতাংশ মানুষকে এখনো সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। তবে সরকারি হাসপাতালে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিনামূল্যে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে নানামুখী সংকট রয়েছে।
সূত্র জানায়, গত দুই যুগে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ব্যক্তির ব্যয় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। আর সরকারি ব্যয় কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। বিগত ১৯৯৭ সালে একজন ব্যক্তিকে তার চিকিৎসা ব্যয়ের ৫৫ শতাংশ বহন করতে হতো। আর সরকারি ব্যয় ছিল ৩৭ শতাংশ। ২০০০ সালে ব্যক্তির ওই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় কমে হয় ৩৩ শতাংশ। ২০০৩ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৫৯ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় আরো কমে হয় ৩১ শতাংশ। ২০০৬ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৫৮ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় ৩২ শতাংশ। ২০০৯ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৬০ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় ২৫ শতাংশ। ২০১২ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৬৩ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় ২৩ শতাংশ। ২০১৫ সালে ব্যক্তির ব্যয় ৬৭ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২০ সালে ব্যক্তির ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যক্তি ও সরকারের বাইরে অবশিষ্ট ব্যয় বহন করে এনজিও, প্রাইভেট সেক্টর ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।
সূত্র আরো জানায়, ব্যক্তির ওপর স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কমাতে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বিগত ২০১২ সালে ২০ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল। ওই কৌশলপত্রে বলা হয়েছিল, ক্রমান্বয়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনা হবে। ২০৩২ সালে ব্যক্তির ব্যয় কমে ৩২ শতাংশ হবে। কৌশলপত্র প্রণয়নের সময় ব্যক্তির ব্যয় ছিল ৬৩ শতাংশ। কিন্তু গত ৫ বছরে ব্যক্তির ব্যয় আরো প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্রসী সীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর অসুস্থতার কারণে নতুন করে ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্রতার শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত অর্থে প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে বাজেটে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হলেও তা প্রত্যাশিত পর্যায়ের নয়। ব্যক্তির ব্যয় কমাতে হলে স্বাস্থ্য, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত ফল মিলবে না।
অন্যদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ জানান, ২০১২ সালে বলা হলেও কর্মসূচিটি ৩ বছর পর ২০১৫ সালে চালু হয়। সারাদেশের মানুষের তিনটি ক্যাটাগরি করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি রোডম্যাপ হাতে নেয়া হয়। প্রথম ধাপ ছিল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। তারই অংশ হিসেবে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের আওতায় টাঙ্গাইলের তিন উপজেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। প্রকল্পটি সফল হলে ধাপে ধাপে সারাদেশে তা ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণও করা হয়। কিন্তু কর্মসূচি মূল্যায়ন করে দেখা গেছে মানুষের মধ্যে বিষয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। কার্ড থাকলেও অনেকে তা ব্যবহার করে না। আবার ভর্তি রোগী ছাড়া ওই কার্ডের সুবিধা অন্যরা পায় না। সেটি বিন্যাস করে আরো ভালো কিছুর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করা যায় তাতে সুফল মিলবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, দেশের সব মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা সম্ভব নয়। বিত্তবানরা অর্থ ব্যয় করে যে কোনো জায়গায় চিকিৎসা নিতে পারেন। কিন্তু যাদের টাকা নেই বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ টাকার অভাবে যেন চিকিৎসা বঞ্চিত না হয়, সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে। সেজন্য রোডম্যাপ প্রণয়নের কাজ চলছে। ধাপে ধাপে মানুষ এর সুফল পাবে।