April 27, 2024

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Tuesday, April 12th, 2022, 9:26 pm

কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না রাজধানীর যানজট

সড়কের উপর থেমে আছে যানবাহনের জট, কিছুক্ষন পরপর থেমে থেমে চলছে যানবাহন। সকাল থেকে রাজধানীর চারপাশে বেড়েছে যানবাহসেন চাপ,নিয়ন্ত্রনহীন ট্রাফিক ব্যাবস্থা। ছবিটি মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটের সময় গুলিস্তান এলাকা থেকে তোলা।

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রমজান মাস এলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একটা আকাক্সক্ষা থাকে তারা যেন পুরো মাসটা স্বস্তিতে থাকতে পারেন। এ মাসে যেন দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস ইত্যাদি যেন থাকে নিরবচ্ছিন্ন- এমনটাই আশা করেন তারা। কিন্তু এবার রমজানের প্রথম দিন থেকেই নানারকম অসংগতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানীর ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। একদিকে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, গ্যাস সংকট, সড়কে মৃত্যু, খুন, ডায়রিয়াসহ হরেক রকমের যন্ত্রণা নিয়ে দিনাতিপাত করছে মানুষ। অন্যদিকে রাজধানীর যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘর থেকে বেরোলেই স্থবির হয়ে যায় জীবন। যানজটে অলিগলি, প্রধান সড়ক সর্বত্রই এখন স্থবিরতা। একে তো তীব্র গরম, তার ওপর অসহনীয় যানজট, জীবন যেন ওষ্ঠাগত। আর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও যানজট নিরসনে কোনো প্রকল্পই সফল হচ্ছে না সরকারের। ঢাকার সড়ক ও পরিবহন খাতে এক দশকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। অথচ এখনো রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহন চলছে ট্রাফিকের হাতের ইশারায়। স্বয়ংক্রিয় সব সিগন্যাল প্রায় অকার্যকর। নাজুক গণপরিবহন ব্যবস্থায় দুর্ভোগের অন্ত নেই নগরবাসীর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সব রকম চেষ্টা অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ায়, এবার যানজট নিরসনে পাতাল রেল ও ভূগর্ভস্থ পরিবহন ব্যবস্থার (সাবওয়ে) দিকে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিশাল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক নির্মাণের পর ঢাকার যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে বলে আশা করা যায়। জানা গেছে, সরকার ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) তৈরি করেছিল, যা ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু পরিকল্পনা অনুসারে অনেক কাজই হয়নি। এরপর ২০১৫ সালে সংশোধিত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) তৈরি করা হয়, যার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত।

সড়কের উপর থেমে আছে যানবাহনের জট, কিছুক্ষন পরপর থেমে থেমে চলছে যানবাহন। সকাল থেকে রাজধানীর চারপাশে বেড়েছে যানবাহসেন চাপ,নিয়ন্ত্রনহীন ট্রাফিক ব্যাবস্থা। ছবিটি মঙ্গলবার বিকাল ৪টা ২৫ মিনিটের সময় গুলিস্তান এলাকা থেকে তোলা।

ঢাকায় যত প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে ও হবে, এর সবই এই পরিকল্পনার আওতায় হওয়ার কথা। আরএসটিপিতে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যানবাহন পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং বাসসেবার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাদ দিয়ে সরকার বিপুল ব্যয়ে উড়ালসড়কের মতো বড় প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু নগরবাসীর দুর্ভোগ তো কমেনি, বরং কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক সূচকে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় ঢাকা প্রথম দিকেই থাকছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপে ঢাকায় অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো সূচকগুলোর পাশাপাশি সড়ক ও গণপরিবহনের অবস্থাও নেতিবাচাক ভাবে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দেশের মেগাসিটিতে মোট জায়াগার ২৫ ভাগ রাস্তা থাকা আবশ্যক। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় রাস্তা আছে মোট ৮ শতাংশ। এই ৮ শতাংশ রাস্তার বিভিন্ন জায়গা সিটি করপোরেশন লিজ দিয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। যা যানজট সৃষ্টির পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তারা। আরএসটিপিতে বাসের বিশৃঙ্খলার পেছনে মালিকানার ধরন, পরিচালনা ও সড়ক ব্যবস্থায় ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়। এর জন্য বিক্ষিপ্তভাবে বাসের অনুমোদন না দিয়ে পরিকল্পিত ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর প্রক্রিয়াটি থেমে যায়। বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির দুই মেয়রও এ বিষয়ে আর খুব একটা এগোতে পারেনি। এটি এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়েই রয়েছে। এদিকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কের মোড় ও যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানে কেবল কার্যকর পদক্ষেপের অভাবেই তৈরি হচ্ছে যানজট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যেসব গাড়ি সোজা যাওয়ার কথা সেগুলোও বাম লেন ধরে চলছে। গণপরিবহনের মধ্যে বাসগুলো এ ক্ষেত্রে বেশি বেপরোয়া। মোড়ের পর বাস্ট স্টপেজ থাকলেও তারা মোড়ের মুখেই যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এতে পেছনের গাড়িগুলো সামনে এগোতে পারছে না। ফলে সিগন্যাল ছাড়লেও থেমে থাকতে হচ্ছে পরিবহনগুলোকে। অনেক সময় মোড়ের মুখে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের ফলেও এমন হচ্ছে। সড়কগুলো পর্যবেক্ষণ করে আরো দেখা যায়, যেসব সড়কে রিকশা-ভ্যানসহ প্যাডেলচালিত পরিবহন চলছে, সেখানে লেন ব্যবস্থা আরো প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্যাডেলচালিত পরিবহনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাম লেন দখল করে আছে। এর বাইরে যেসব এলাকায় তিন চাকার ইঞ্জিনবিহীন যানগুলো চলতে দেখা গেছে, সেখানে সড়কের গাড়ির গতিও থাকে কম। জানা গেছে, যানজট নিরসনে ঢাকায় বাস্তবায়নাধীন বেশিকিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একটি রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি) অনুমোদন করে সরকার। যাতে পাঁচটি পাতাল রেললাইন, দুটো দ্রুতগতির বাস রুট এবং এক হাজার ২০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান সড়ক নেটওয়ার্কের দ্বিগুণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং তিনটি রিং রোড অন্তর্ভুক্ত আছে। আগামী ২০ বছরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে আরএসটিপির অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এদিকে এতগুলো মেগাপ্রকল্প থাকার পরও রাজধানীর যানজট নিরসন নিয়ে এখনো শঙ্কিত সরকার। তাই মেগাপ্রকল্পের পাশাপাশি পাতাল রেল ও ভূগর্ভস্থ পরিবহন ব্যবস্থার (সাবওয়ে) দিকে মনোযোগ দিয়েছে সরকার। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা আশা করেন বিশাল ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক নির্মাণের পর ঢাকার যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যদিও স্বীকার করেছেন একটি উপযুক্ত পাতাল রেল সড়কে যানজট কমাতে সাহায্য করবে। মাত্র এক কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মাণের খরচ দিয়ে একটি মানসম্পন্ন বাস সার্ভিস নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানান তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, সরকার বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির পরিবর্তে গতি বাড়াতে বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে। রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন করা অপরিহার্য। কারণ অনেক দেশেই সাধারণ মানুষ শহরে পাবলিক বাস ব্যবহার করেন এমনকি তাদের পাতাল কিংবা মেট্রো রেল থাকার পরও। বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মেগাপ্রকল্পের পাশাপাশি সরকারের উচিত সড়ক ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি করা, কারণ এটি সস্তা।