April 23, 2024

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Wednesday, March 1st, 2023, 9:23 pm

ব্যবহার না হলেও বিপুল ব্যয়ে গ্যাস লাইন নির্মাণ

ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ব্যবহার না হলেও দেশে বিপুল ব্যয়ে গ্যাস লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। আর বিপুল বিনিয়োগের ওই গ্যাস লাইন অব্যবহৃত অবস্থায় মাটির নিচে পড়ে আছে। তারপরও থেমে নেই কাজে না লাগলেও সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে এমন ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত প্রকল্প। প্রায় ১২শ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা-যশোর অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। গ্যাস সংকটের মুখে সরকার পরে ওই প্রকল্প বাতিল করে। মূলত রাজনৈতিক কারণেই অহেতুক গ্যাস পাইপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও পেট্রোবাংলা দিচ্ছে ২৭৪ কোটি ঘনফুট। বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার গ্যাস আমদানি করেও শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না। তার মধ্যেই নতুন এলাকায় গ্যাস দেয়ার প্রকল্প পুরোপুরিই অপচয়। বর্তমানে অপরিকল্পতিভাবে নেয়া গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি-জিটিসিএলের ৯ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার পাইপলাইন পূর্ণসক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। তারপরও সংস্থাটি আরো ৩ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তার মধ্যে ১ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে ১৫০ কিলোমিটার বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্পকারখানাই গ্যাস পাচ্ছে না, সেখানে উত্তরাঞ্চলে গ্যাস দেয়া পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর ৮২৩ কোটি টাকায় ধনুয়া-এলেঙ্গা-নকলা পাইপলাইন নির্মিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে গ্যাস সংকটে এটিও খুব বেশি কাজে লাগবে না।
সূত্র জানায়, লাভজনক প্রতিষ্ঠান জিটিসিএল অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প খরচ মেটাতে এখন লোকসান গুনছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট ২১৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। পাইপলাইন নির্মাণে সংস্থাটির ৯ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত ও আমদানি করা গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ইে অবকাঠামো পূর্ণসক্ষমতায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। অথচ ওই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের জন্য ৪৮৪ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ প্রয়োজন। প্রতি ঘনমিটারে যার পরিমাণ ০.২৩১৪ টাকা; যা সঞ্চালন মাশুলের সঙ্গে যোগ করতে চায় জিটিসিএল। লোকসান কমাতে জিটিসিএল গ্যাসের সঞ্চালন চার্জ (মাশুল) একলাফে প্রায় পাঁচ গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কোম্পানিটির বর্তমান মাশুল প্রতি ঘনমিটারে ০.৪৭৭৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২.০৪৬৯ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। সঞ্চালন মাশুল বাড়লে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম আরো বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, কয়েক বছর ধরেই গ্যাস সংকটের কারণে আবাসিকে সংযোগ বন্ধ রয়েছে। নতুন সিএনজি স্টেশন স্থাপনেরও অনুমতি মিলছে না। শিল্পেও সংযোগ দেয়া হচ্ছে বাছবিচার করে। তারপরও নতুন পাইপলাইন স্থাপন ও বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়নে তিতাস প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা খরচের উদ্যোগ নিয়েছে। ওসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়কে বিদ্যমান গ্যাস নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপন (১৯৪ কিলোমিটার), ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার এলেঙ্গা থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত ৫০২ কিলোমিটার ও মানিকগঞ্জ থেকে ধামরাই পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ প্রকল্প এবং ১ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল চার লেন মহাসড়কে বিদ্যমান নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপন (২২১ কিলোমিটার) প্রকল্প। যাচাই-বাছাই ছাড়া নেয়া ওসব প্রকল্পে ঋণ করা বিনিয়োগ উসুল হয় না। ফলে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে কোম্পানিগুলো লোকসান গুনছে। আর গ্রাহকের ওপর তার দায় চাপানো হয়। ক্ষতি সামলাতে বারবার বাড়ানো হয় দাম।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, আদতে গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের প্রয়োজন আছে কিনা সেজন্য আর্থিক ও কারিগরি সমীক্ষা করা হয় না। বরং দেশের অধিকাংশ এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গ্যাস পাইপলাইন বসানো হয়। খুলনায় হাজার কোটি টাকা খরচ করে লাইন ফেলে রাখা হয়েছে। এখন উত্তরাঞ্চলে গ্যাস নিতে আবার লাইন করা হচ্ছে, যা কোনো কাজে আসবে না। সরকার আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে, তবু বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কেন নেয়া হচ্ছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রুখসানা নাজমা ইসহাক জানান, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ কী ফল বয়ে আনবে তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে বর্তমানে কোম্পানি লোকসানে রয়েছে। তাই মার্জিন বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। না হলে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশীদ মোল্লাহ জানান, তিতাসের নেটওয়ার্ক অনেক পুরোনো ও জীর্ণ, তাতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। সেজন্যই পাইপলাইন প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এই বিনিয়োগ তিতাসকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলবে।